নিষিদ্ধ স্বপ্ন। (১৪তম পর্ব) বাংলা উপন্যাস। আশিষ কৃষ্ণমুখ। যার কেহ নেই তার জন্য আল্লাহ আছে।
১৪তম পর্ব — যার কেহ নেই, তার আল্লাহ আছেন
একজন মা, এক অসহায় মুহূর্ত, আর এক অচেনা মানুষের সহানুভূতি—এই পর্বে অনুপমার জীবনে ঘটে যায় এক অলৌকিক ঘটনা। পড়ে দেখো, কেমন করে বিশ্বাস জিতে নেয় হতাশাকে।
নিষিদ্ধ স্বপ্ন। চতুর্দশ অধ্যায়
পরদিন সকালটা যেন একটু হালকা। হাসপাতালের কেবিনে অনুপমার ছেলেকে তুলে দেওয়া হয়েছে। ডাক্তার এসে বললেন —
“এখন আর কোনো আশঙ্কা নেই, কালই বাড়ি নিতে পারবেন।”
এই কথাটুকুই অনুপমার চোখে এক চিলতে আলো জ্বেলে দিল। কিন্তু পরক্ষণেই আকাশ ভেঙে পড়ার মতো খবর —
হাসপাতালের বিল এসেছে দেড় লাখ টাকা!
সংবাদটা শুনে অনুপমার মুখের রঙ মুহূর্তে উড়ে গেল। গলা শুকিয়ে উঠল।
রুবি আপা অপরাধী চোখে তাকিয়ে বললেন —
“আমি তো অবস্থা দেখে এখানে নিয়ে এসেছিলাম। জানলে সরকারি হাসপাতালে চেষ্টা করতাম। এতটা বিল আসবে ভাবিনি।”
অনুপমা বিধ্বস্ত কণ্ঠে বলল,
“এখন কি হবে আপা? কালকের জন্য বাসায় চালও নেই। আমি এতো টাকা দেব কোথা থেকে?”
রুবি শান্ত স্বরে বললেন,
“চিন্তা করো না, আল্লাহ আছেন, আমি তোমাকে হাজার দশেক টাকা দিতে পারি। তবে তোমার আত্মীয়রা? কারো কাছ থেকে কিছু পাওয়া যাবে?”
অনুপমা একে একে সবার নাম মনে করে, ফোন করে, হাত পাতে — কেউ কেউ সান্ত্বনা দেয়, কেউ বলে ‘এই মাসে চাপ আছে’। শেষে হাতে আসে সামান্য কিছু টাকা, যা এই বিশাল বিলের সামনে যেন ফোঁটা জল।
রুবি কাছে এসে বললেন,
“তুমি যদি অনুমতি দাও, আমি একটু চেষ্টা করি।”
“কিভাবে আপা?”
“সোশ্যাল মিডিয়ায় একটা পোস্ট দিলে কেমন হয়? হয়তো কেউ সাহায্যের হাত বাড়াবে।”
অনুপমা একবার রুবির দিকে তাকিয়ে দেখল — ক্লান্ত, ভাঙা চোখে একটুখানি আশা জ্বলে উঠল। তবুও যেন দ্বিধা কাজ করছে ভেতরে ভেতরে।
রুবি বলল, আজকাল এইসব কোনো ব্যাপার না। ভরসা রাখো।
চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছিল সৈকত। সামনে ল্যাপটপ, স্ক্রিনে ফাইলের পর ফাইল। এখন সে ব্যস্ত ব্যবসায়ী, নিজস্ব আইটি ফার্ম খুলেছে, অফিসে ডজনখানেক কর্মচারী কাজ করে। সাফল্যের আলো তাকে ধরা দিয়েছে কল্পনার বাইরে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢুকার খুব সময় হয় না তার। আজকাল ভালোও লাগে না। রাজনৈতিক কাঁদা ছুড়াছুঁড়ি। আস্ফালন, নোংরামী। এইসবের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া তার কাছে বড় বিরক্তিকর ব্যাপার।
অনেক দিন পর চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে ফেইসবুকের পাতা স্ক্রল করে হঠাৎ চোখ আটকে গেল এক পোস্টে—একজন মায়ের সাহায্যের আবেদন।
সে ধীরে ধীরে পোস্টটা পড়ল। শিশুর অসুস্থতার কথা, হাসপাতালের বিল পরিশোধ করতে পারছে না বলে শিশুটিকে বাসায় নিয়ে যেতে পারছে না। একটুকরো ছবিতে শিশুটির মুখ—শান্ত।
সৈকতের বুক কেমন করে উঠল। কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল। তারপর নিজের মনে বলল,
— “এখন তো সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেক ধোঁকাও চলে। যদি... সত্যি হয়?” তাহলে ব্যাপারটা খুব হৃদয় বিদারক।
স্ক্রিনে থাকা ফোন নম্বরটা কপি করে মোবাইলে লিখে রাখল।
সৈকত তার অফিসে পৌঁছে নিজের চেয়ারে বসল। আধুনিক কাচের ঘেরা একটি অফিসরুম, টেবিলে ল্যাপটপ, পাশে চায়ের কাপ। কফি-গন্ধে মিশে আছে পরিশ্রমের ঘ্রাণ।
সৈকত এক নতুন ক্লায়েন্টের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার মুখে ফুটে উঠল প্রশান্তির হাসি।
“২০০ ডলারের প্রজেক্টটা ফাইনাল হলো!”
চেয়ারে হেলান দিয়ে সে গভীর নিঃশ্বাস ফেলল। মনে মনে বলল,
“আল্লাহ চাইলে কি না হয়? ছ’মাস আগেও চোখের সামনে অন্ধকার ছাড়া কিছু ছিল না। মাকে ডাক্তার দেখানো জন্য ৮০০ টাকাও ছিল না। আজ সকালেই ২০০ ডলারের কাজ!”
সে উঠে অফিসটা ঘুরে এল। কর্মচারীরা মনোযোগ দিয়ে কাজ করছে ।
নিজের আসনে ফিরে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে সকালে দেখা ফেইসবুক পোস্টটির কথা মনে পড়ল — সোশ্যাল মিডিয়ায় এক অসহায় মায়ের আবেদন।
"সন্তানকে হাসপাতাল থেকে ছাড়িয়ে নিত টাকা লাগবে..."
সৈকত একটু থামল। ভাবল, “এগুলো অনেক সময় ভুয়া হয়… কিন্তু যদি সত্যি হয়?”
ফোনটা তুলে নম্বরটা ডায়াল করল। ওপাশে রুবি ফোন ধরল।
— “আপনার পোস্টটা দেখেছিলাম। টাকার ব্যবস্থা হয়েছে?”
— “না, এখনো হয়নি।”
— “রোগী এখনও হাসপাতালে?”
— “জি।”
— “ঠিকানা দিন, আমি আসছি।”
এক ঘণ্টার মধ্যে সৈকত হাসপাতালে পৌঁছে গেল। রুবি তাকে দেখে অবাক।
“আপনার নাম?”
“রুবি ইসলাম ।”
“রোগী আপনার কে হয়?”
“প্রতিবেশী।”
সৈকত চুপচাপ শিশুটির কেবিনে ঢুকল। ঘুমন্ত শিশুটির মুখে শান্তি, কিন্তু চারপাশের পরিবেশে এক চাপা শঙ্কা।
“ বাচ্চাটির গার্ডিন কোথায়?” সৈকত জিজ্ঞেস করল।
রুবি উত্তর দিল, “মা টাকার জন্য পাগলের মতো দৌড়াচ্ছে। এখন কোথায় আছে জানি না।”
“আর বাবা?”
রুবি একটু থেমে বলল, “বাবা নেই।”
সৈকতের মুখে গম্ভীরতা নেমে এলো। কিছুক্ষণ পর সে বলল,
“চলুন, বিলিং কাউন্টারে যাই।”
রুবি কিছু বুঝে উঠার আগেই সৈকত সব বিল পরিশোধ করে ফেলল। এরপর রুবির হাতে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে বলল,
“এটা দিয়ে ওর যাবতীয় ওষুধপত্র কিনে দিয়েন। বাড়ি ফিরতে খরচ লাগবে।”
রুবি স্তব্ধ। তার কণ্ঠ কাঁপছে,
রুবিকে লক্ষ্য করে সৈকত বলল,
“আপনি সত্যিই একজন ভালো মানুষ। ভিন্ন ধর্মের প্রতিবেশীর জন্য এমন সহানুভূতি... সত্যি প্রশংসনীয়।”
রুবি মুগ্ধ হয়ে হাসল
সৈকতও একটু হাসল, আর কিছু না বলে রিকশায় উঠে চলে গেল।
কিছুক্ষণ পরে অনুপমা হাসপাতালের ওয়েটিং রুমে এসে বসে পড়ল। চোখ দিয়ে ঝরছে অশ্রু, গলায় একরাশ ব্যথা জমে আছে।
রুবি এসে তার পাশে বসে হাত ধরল।
“কি হলো অনুপমা?”
অনুপমা কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“আমি পারলাম না আপা... সবাই ফিরিয়ে দিল। আমার ছেলেকে বাড়ি নিতে পারব না।”
রুবি শান্ত গলায় বলল,
“চলো, তোমার ব্যাগ গুছানো আছে। বাড়ি যাই।”
অনুপমা অবাক, “কি বলছেন আপা?”
“তোমার বিল পরিশোধ হয়ে গেছে। একজন ভদ্রলোক আমার পোস্ট দেখে সব পরিশোধ করে গেছেন। এই নাও, এটাও দিয়ে গেছেন তোমার হাতে দিতে।”
অনুপমা হতবাক।
“কে ছিলেন উনি? কোথায় থাকেন?”
রুবি নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
“জানতে পারিনি। উনি চলে গেছেন চুপচাপ। শুধু মনে হয়, উনি ছিলেন আল্লাহর পাঠানো কেউ। আমি বলেছিলাম অনুপমা — যার কেহ নেই, তার আল্লাহ আছেন।”
অনুপমা নিঃশব্দে মাথা নোয়াল। চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ল মুক্তোর মতো অশ্রু।
Meta Description:
অনুপমার ছেলের জীবন বাঁচাতে টাকার অভাবে ভেঙে পড়ে সে। ঠিক তখনই অজানা এক মানুষ সাহায্যের হাত বাড়ায়। মানবতা ও বিশ্বাসের আবেগঘন গল্প।
SEO Keywords:
সুখ সুদূরে ১৪তম পর্ব
অনুপমা ও সৈকতের গল্প
মানবতার গল্প
বাংলা উপন্যাস ২০২৫
আবেগঘন বাংলা গল্প
আশিষ কৃষ্ণমুখের গল্প
যার কেহ নেই তার আল্লাহ আছেন
বাস্তবধর্মী বাংলা উপন্যাস
দুঃখের গল্প বাংলা
মা ও সন্তানেরর গল্প

Nice
উত্তরমুছুনবিপদ কেউ না কেউ পাশে দাঁড়াবেই
উত্তরমুছুন