সুখ সুদূরে – ( ১৪ম) পর্ব | বাংলা উপন্যাস। মানবিকতা, আত্মসম্মান এবং জীবনের বাস্তবতা নিয়ে লেখা হৃদয়স্পর্শী বাংলা গল্প।
🔍 SEO মেটা-বর্ণনা:
একজন চাকরি হারানো মানুষের অন্তর্দহন, ক্ষুধা, আত্মসম্মানবোধ এবং এক সাধারণ রিকশাওলার আন্তরিকতার স্পর্শ – এই পর্বে উঠে এসেছে আরিফের জীবনের চরম দুর্দিনের একদিনের গল্প। মানবিকতা, আত্মসম্মান এবং জীবনের বাস্তবতা নিয়ে লেখা হৃদয়স্পর্শী বাংলা গল্প।
সুখ সুদূরে – ১৪তম পর্ব
আরিফ ফুটপাত ধরে হাঁটছে। রোদে নিস্তেজ লতার মতো শরীর ভেঙে পড়ছে। খুব ইচ্ছে করছে রাস্তার পাশে বড় গাছটির নিচে
ঘুমিয়ে পড়তে। রাস্তায় ঘুমানোর অবস্থা এখনো আসেনি ভেবে দুলে দুলে হাঁটছে। পা ভেঙে আসছে।
এক মাস হলো পথে পথে হাঁটছে একটি চাকরির জন্য। আরিফ যেমনটা ভেবেছিল, বাস্তবে বিন্দুমাত্র সত্যি হলো না। ভেবেছিল মুহিত চলে যাওয়ার পর বাইরে বের
হলেই একটা চাকরি জুটে যাবে। কিন্তু কিছুই হচ্ছে না। হবে বলেও কোনো সম্ভাবনা দেখছে না। দুশ্চিন্তায়, অনাহারে আরিফ যেন মাটির সাথে মিশে যাচ্ছে।
দূর থেকে আরিফকে দেখে জজু মিয়া দ্রুত বেগে প্যাডেল মেরে সামনে এসে রিকশা থামাল। আরিফের কোনো রকম গুরুত্ব নেই সেদিকে। জজু মিয়া রিকশা থেকে নেমে এসে বলল:
— ভাইজান,
কতদিন আফনেরে দেহি না। আফনে ভালা আছেন ভাইজান?
আরিফ শান্তস্বরে বলল,
— ভালো।
এর থেকে বেশি কথা বলতে ইচ্ছে করছে না তার।
— কই যান?
— বাসায়।
— আফনের বাসা দ মেলা দূর!
হাইট্টা যাইবেন?
— হ্যাঁ।
— ভাইজান কী আমার উপরে
রাগ হইছেন?
— না। তুমি রাগ করার মত কী বলেছ?
— এই যে, কইলেন হাইট্টা যাইবেন, আমিও বেক্কেলের মত জিগাইলাম।
— হেঁটে যাব তাই বলেছি।
— রমনা থেকে শাহজাহানপুর হাইট্টা যাইবেন! আফনের মন খারাপ? বড়
লোকের মন খারাপ থাকলে
চাঁন্দের দিকে চাইয়া থাহে, পানির দিকে চাইয়া থাহে, মেলা দূর রাস্তা একলা একলা হাডে। এর লাইগা কইলাম।
আরিফ কোনো জবাব না দিয়ে হাঁটতে
লাগল।
জজু মিয়া রিকশা নিয়ে সামনে এসে বলল,
— ওডেন রিকশাত, ওডেন।
— রিকশায় উঠব? আমার পকেটে টাকা নেই।
জজু মিয়া কালো দাঁত বের করে হেসে বলল,
— ভাইজান কী যে কন!
আফনের টেহা নাই। গরীব বইলা পরীক্ষা নিতাছেন?
— আমি সত্যি বলছি, আমার পকেটে টাকা নেই।
— পকেটে নাই, বাসায় দ আছে। পরে
দিয়েন।
— কবে দিব বা দিতে পারব
কিনা আমি জানি না। তার চেয়ে বরং এইটুকু জায়গা আমি হেঁটেই চলে যেতে পারব।
জজু মিয়া পীড়িত চোখে তাকায়।
— ভাইজান, আফনের কী হইছে? মেলা
দিন আফনেরে চিনি। এমন কথা কওনের মানুষ আফনে না। রিকশাত ওডেন, ভাড়া লাগব না।
আরিফ কিছু ভাবতে থাকে।
— ভাইজান, ওডেন।
জজু মিয়ার বাড়াবাড়িতে আরিফ রিকশায় উঠে বসল। রিকশা ও গাড়ির জট
ঠেলে চলে। কোথাও আবার জ্যামে পড়ে থেমে থাকে। আরিফ চুপ করে বসে ঢাকা শহর দেখে। রঙ-বেরঙের এই
শহর তাকে আজ বিবর্ণ লাগে।
এত চেনা শহরটাও আজ অচেনা লাগে।
কেন এমন মনে হচ্ছে, বুঝতে পারছে না। কারণও খুঁজে না।
জজু মিয়া ঘাড় ফিরিয়ে বলল,
— দুনিয়াডা একটা আচানকের জাগা। এই রিকশায় চইড়া
ভাবী-ভাতিজারে লইয়া কত ইস্কুলে গেছে।
আমার রিকশাডা আছে, অথচ ভাবী দুনিয়াত নাই...
(দীর্ঘশ্বাস ফেলে)
সবই আল্লা পাকের ইচ্ছা। কে কবে যাইব
আল্লাই ভালা জানে। মনে দুঃখ রাইখেন না। ভাতিজারে ইস্কুলে যাইতে দেহি না। ইস্কুলে কে লইয়া যায়?
জজু মিয়ার কথায় আরিফের মন নেই। সে
ঘোরের মধ্যে আছে। এই ঘোর থেকে
সহসা বের হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
হঠাৎ করে বলে উঠল,
— আচ্ছা, জজু মিয়া, তুমি কী আমাকে একটা
চাকরি দিতে পারো?
জজু মিয়া হো হো করে
হেসে উঠল।
— আর মানুষ পাইলেন না? জজু মিয়ার সর্বশক্তি দিয়ে প্যাডেলে চাপ দিয়ে, মেরুদণ্ড সোজা করে বলল—
রিকশাওলার কাছে আফনে চাকরি চাইলেন? রিকশাওলা আফনেরে কী চাকরি দিব!
আর একটা রিকশা দিবার পারি, চাকরি না। এই কাম আফনেরে
শোভা পায়?
শিক্ষিত লোকেরা যখন কান্ডজ্ঞানহীনের মতো কথা বলে, তখন জজু মিয়ার মতো লোকেরা খুব মজা পায়। তার মনে হলো আরিফ কান্ডজ্ঞানহীন কথা বলেছে। সে মজা পাচ্ছে।
— অনেকদিন পর আফনের কথায়
মন বইরা হাসলাম। আফনের পুরান চাকরি কী হইছে?
আরিফ কোনো জবাব দেয় না।
— দোকান-পাটে হলেও করব। আছে তোমার পরিচিত কোনো দোকান?
জজু মিয়া রিকশা থামায় রাস্তার পাশে একটা চায়ের দোকানে। ঠাট্টা করছে বলে মনে হলো না। মলিন মুখ। এই মুখে ঠাট্টা
করা যায় না।
— ভাইজান, নামেন, চা খামু।
— আমি খাব না।
— জানি আফনের পকেটে টেহা নাই।
— না, আমি চা খাই না।
— আইজ খান। ভালা লাগব। গরীব বইলা কী এক কাপ
চা খাওনের সুযোগ দিবেন না?
দোকানদার চা বানায় গম্ভীর
মুখে। নিজেকে রাজা মনে হয় যেন। চা
বানানোর শব্দে একটা ছন্দ বাজে।
আরিফ ভাবে — রাস্তার পাশে চায়ের দোকান খোলা মন্দ নয়। কম পুঁজি, কিন্তু
চাঙ্গা ব্যবসা। নিজের স্বাধীনতা। কারো চোখ রাঙানি নেই, জবাবদিহিতা নেই। চাকরি যাওয়ার ভয় নেই।
জজু মিয়া কলা ছিঁড়ে দেয় হাতে।
— ভাইজান, কলা খান। খুবি ভালা জিনিস। শইলডারে নরম রাহে।
জজু মিয়ার আচরণে মনে হয়, আরিফ আর তার মধ্যে
তফাৎ নেই। একই শ্রেণির। তবুও জজু মিয়াকে আপনজন মনে হয়। ক্ষুধায় পেট চু চু করছিল,
তবু খাবে! এতটা অসহায় আমি? ভাবে আরিফ। চোখ স্যাঁতস্যাঁতে হয়।
কিন্তু এক কাপ চা,
এক টুকরো বনরুটির মধ্যে যদি ভালোবাসা থাকে, সেটা না খেলে কষ্ট
দেয়। সে খায়।
চা খাওয়া শেষে রিকশায় বসে পড়ে আরিফ।
জজু মিয়া বলল,
— চাকরি দেওনের মত চাকরির খবর
আমার কাছে নাই। তবে রিকশার চাইতে ভালা আছে। গাড়ির হেলপারের চাকরি দিতে পারি। আমার পরিচিত এক ড্রাইভার আছে।
তবে হেলপারের একটা সমস্যা আছে। মা-বইন লইয়া
গালি খাইতে হয়। কখনো ড্রাইভারের, কখনো পাবলিকের।
রিকশা আরিফের বাসার সামনে এসে থামল।
— বেশি দরকার অইলে করতে পারেন...
রিকশা ছুটে চলে। শীত পড়ে গেছে। তবু জজু মিয়ার শার্ট ঘামে ভেজা। এটাই হয়তো গরীবের ‘রক্ত পানি করা পরিশ্রম’।
আরিফ সেদিকে অসহায়ের মতো তাকিয়ে থাকে।

Valo legeche
উত্তরমুছুন