সুখ সুদূরে – ( ১৩ম) পর্ব | বাংলা উপন্যাস।হৃদয়ছোঁয়া একটি বাংলা পারিবারিক গল্প



Meta Description:

মা হারা শিশু মুহিত মায়ের শিকড় খুঁজতে ফিরে আসে নানা-নানির বাড়িতে। অপরিচিত এক রাজ্যে এসে মায়ের স্মৃতি, মামার পাগলামি আর নানাবাড়ির বিষণ্ন আনন্দের ভেতর ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে সম্পর্ক। এক হৃদয়ছোঁয়া বাংলা ছোটগল্প।


সুখ সুদূরে ১৩ তম পর্ব

ঘাসের গালিচা ভেদ করা রাস্তা দিয়ে গাড়িটি যখন বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল, তখন রহমান সাহেব বিছানায় আধশোয়া। গাড়ির শব্দে তিনি উঠে বসলেন। আফরোজা বানু মুহিতকে নিয়ে অতি ব্যস্ততায় বারান্দা পেরিয়ে ড্রয়িংরুমে ঢুকলেন। আরিফের ফোন পাওয়া থেকে এই অস্থিরতার শুরু।

মুহিত ভিতরে প্রবেশ করে বেশ চমৎকৃত হয়। হলরুমের মতো এক বিশাল ড্রয়িংরুম। চকচকে মেঝে—মুখ দেখা যায়। মাঝখানে বিলাসবহুল সোফা। সোফায় বসলে বাড়ির প্রধান ফটক পর্যন্ত চোখ যায়। রহমান সাহেব এখানে বসেই দিনের বেশিরভাগ সময় ব্যয় করেন। পশ্চিমাংশে ডাইনিং, পূর্ব-দক্ষিণের দেয়াল ঘেঁষে দোতলায় উঠার সিঁড়ি। দোতলায় পাশাপাশি দুটি মাত্র রুম—একটি রুনার, অন্যটি শাওনের। দুটি রুমের ভিতর-বাইরে উভয় দিকে রয়েছে প্রশস্ত বারান্দা। নিচে ড্রয়িংরুম ছাড়াও আরো পাঁচটি রুম রয়েছে। নিচে সামনের দিকের খোলামেলা রুমটিতে রহমান সাহেব ও আফরোজা বানু থাকেন।

রহমান সাহেব তাদের শব্দ শুনে বেরিয়ে এলেন। সালমা ও রিপনও এসে দাঁড়িয়েছে। হা হা হা—উচ্চ শব্দ করে হেসে মুহিতকে জড়িয়ে ধরলেন রহমান সাহেব, "আমার দাদুভাই চলে এসেছে!"

রিপন হতাশ হয়ে বলল, "ওমা! এইডাডি এদ্দুরা! আমি মনে করছি এর লগে ক্রিকেট খেলমু, কেরাম খেলমু!"

রহমান সাহেব বললেন, "এর সাথেই খেলবি। কানারে পথ দেহান আর এর লগে খেলন একই কথা।"

রিপনের কথা থেকে মনোযোগ সরাতে আফরোজা বানু রহমান সাহেবকে জিজ্ঞেস করলেন, "তুমি খেয়েছো?"

"এইতো, কিছুক্ষণ আগে খেয়ে মাত্র রুমে গেলাম। তোমরা এত তাড়াতাড়ি ফিরবে জানলে অপেক্ষা করতাম।"

"ভালো করেছো। খাওয়ার আগের ওষুধটা খেয়েছো?"

"খেয়েছি, খেয়েছি। আর চিন্তা নেই। আমার দাদুভাই চলে এসেছে। এখন তো আমি শিশু হয়ে যাব। নতুন জীবন। শরীরের সব পার্টস নতুনের মত কাজ করবে। দাদুভাইয়ের সাথে ফুটবল খেলব, ক্রিকেট খেলব, দাদুভাইকে পিঠে চড়াব।"

"হ্যাঁ হ্যাঁ, খুব চড়াবে।" আফরোজা বানুর কথায় রহমান সাহেব থেমে গিয়ে উদাস চোখে মুহিতের দিকে তাকিয়ে বললেন, "বুঝলে দাদুভাই, পাষণ্ড হৃদয়টাকে বদলাতে গিয়ে এখন শুধু বিধি-নিষেধের মধ্যে আছি। ঘোড়ায় মনে হয় তোমাকে চড়ানো হবে না। তবে একটা ছাগলের পিঠে চড়াতে পারি।"

রিপনকে দেখিয়ে বললেন, "এই যে, ওকে দেখছ—আস্ত একটা রামছাগল। ঘাস খায় না কিন্তু ম্যাঁ ম্যাঁ করে।" রিপনের দিকে আবার তাকিয়ে বললেন, "তুই ওকে পিঠে নিয়ে ঘোড়ায় চড়াবি।"

রিপন মুখ মলিন করে বলল, "জি খালু, চড়ামু।" আর কী যেন ভাবল।

"এভাবে বলো না। ছোট মানুষ ভুল কিছু শিখতে পারে।" স্বর নামিয়ে বললেন আফরোজা বানু। সালমার দিকে তাকিয়ে বললেন, "আমাদের নাস্তা দে।"

"কী দেমু?"

"যা যা আছে সবই দে। আমার দাদুভাইয়ের যা খেতে ভাল লাগবে, তাই খাবে।"

রিপনকে বললেন, "ব্যাগটা নিয়ে রুনার ঘরে আয়।"

নয় বছর আগে ঝরে পড়া রুনা নামটি হঠাৎ করে এ বাড়িতে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। এই বাড়ি এখন রুনাময়।

মুহিত শান্ত চোখে চারপাশ দেখছে। বাবার মুখে শুনে যেমনটা ভেবেছিল, তার কিছুই মিলছে না। বাবা বলেছিল, তাদের মস্ত বড় বাড়ি। কিন্তু এত বড় বাড়ি সে ভাবেনি। তার মা এই বাড়ির মেয়ে—তাও এখন বিশ্বাস হচ্ছে না। জন্ম থেকে সে দেখেছে আড়াই রুমের একটি বাসায় তারা সুখে দিন যাপন করছিল। মুহিত চোখের মাপে দেখছে, শুধু ড্রয়িংরুমটি তাদের বাসা থেকে বড়।

রিপন ব্যাগ নিয়ে আগে আগে উঠছে। পেছনে আফরোজা বানু ও মুহিত। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে মুহিত একটা অদ্ভুত অনুভূতি অনুভব করল। তার পুরো শরীর কেঁপে ঢেউ খেয়ে গেল। এই বাড়িতে তার চমৎকৃত হবার ঘটনার শেষ নেই। সিঁড়ির পাশের দেয়াল জুড়ে ঘন সবুজ ঘাস।

মানুষের বসতঘরের দেয়ালে ঘাস থাকে বা থাকতে পারে—তা তার জানা ছিল না। জানার অবশ্যি কারণও নেই। এর আগে ঘাস বিলাসী কারো বাড়ি কখনো যাতায়াত হয়নি। নতুন কিছু—আশ্চর্যজনকই বটে।

ঘরের দেয়ালে ঘাস বিষয়টি তার ভাল লাগছে। ঘাসগুলো আসল না কৃত্রিম—এই প্রশ্ন মনে থাকলেও মুখ ফোটে করা হয় না। সে জানে, ঘাস আসল না নকল তা জানার যথেষ্ট সময় তার হাতে রয়েছে।

রিপন সিঁড়ি দিয়ে ওঠে প্রথম রুমটিতে ঢুকল। আফরোজা বানু রুমে ঢুকে বললেন, "আজ থেকে তুমি এই ঘরে থাকবে। পারবে না থাকতে?"

মুহিত কোনো উত্তর না দিয়ে চুপ করে রইল।

"বুঝতে পেরেছি। রাতে তুমি আমার সাথেই ঘুমাবে।" তারপর তিনি বললেন, "এটা কার ঘর জানো?"

মুহিত মাথা নাড়ল।

"জানো! কার ঘর বলো তো?"

শান্ত স্বরে বলল, "আম্মুর।"

"কীভাবে জানলে? ছবি দেখে?"

"নাহ।" রিপনকে দেখিয়ে বলল, "উনাকে বলেছ ব্যাগ নিয়ে রুনার ঘরে আসতে।"

আফরোজা বানু মুগ্ধ চোখে তাকালেন। দেয়ালে টাঙানো রুনার ছবির কথা বলতে গিয়ে তিনি উদাস হয়ে পড়েন।

এই ঘর অনেকটা মিউজিয়ামের মত। রুনা চলে যাওয়ার সময় যেখানে যা ছিল, আজও তা সেখানেই আছে।

আফরোজা বানু হারমোনিয়ামের কাছে এগিয়ে গিয়ে বললেন, "তোমার মা ভালো গান জানত, তুমি জানো?"

মুহিত মাথা নাড়ল, "হুঁ।"

আফরোজা বানু লক্ষ্য করেছেন, মুহিত প্রায় প্রশ্নের উত্তর মাথা নেড়ে দেয়। তিনি কাছে এসে বললেন, "তোমার কী কথা কম বলার অভ্যাস, না আজ প্রথম এসেছ বলে কথা কম বলছ?"

মুহিত জবাব না দিয়ে চুপ করে রইল।

"আচ্ছা, বুঝেছি। এবার চলো। নাস্তা সেরে নিই। তারপর তোমার সাথে কথা।"

সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে নামতে রিপনকে বললেন, "আজ থেকে তোর কাজ হবে দাদুভাইকে সঙ্গ দেওয়া। তবে দেখিস, ফালতু কথা বলিস না।"

নাস্তা সেরে অল্প সময়ের মধ্যে মুহিত আর রিপন ঘরে ফিরে এলো। রিপনকে অবশ্য আবার নিচে নামতে হলো। বারান্দায় বসার ব্যবস্থা ছিল না। রিপন নিচ থেকে চেয়ার মাথায় করে নিয়ে এলো। তারপর মুহিতের দিকে তাকিয়ে বলল, "শোন, তোরে একটা কথা কই।"

রিপন হঠাৎ থামল। কাচুমাচু করে বলল, "সরি।"

"সরি কেন?"

"তোমারে তুই কইছি। তুমি যদি আঙ্গো মতন গরীব হইতা, তুই কইতাম। গরীব মানুষ বড়লোকেরে তুই কইতে পারে না। ছোড হউক আর বড় হউক।"

"বললে কী হয়?"

"চাকরি থাহে না।"

"তুমি আমাকে তুই করেই বলো। আমরা বড়লোক নই।"

"সর্বনাশ! ফুপা হুনলে আমার চাকরি শেষ।"

"তাদের সামনে বলো না।"

রিপন বলল, "মনে হইতাছে ফুফুর মত তুমিও ভালা মানুষ। এই বাড়িতে আর একজনও ভালা মানুষ নাই।" অঙ্গুলি নির্দেশিকায় বলল, "এই ঘরে থাহে একটা পাগল—তোমার মামা। নাম শাওন। আউলা-জাউলা চুল-দাড়ি লইয়া হাডে। এত বড় লোকের পুত! পরে একটা হইলদ্যা পাঞ্জাবি। সামনে মুখ এনে বলল, খালি পায়ে রাস্তাত হাডে। যত আজগুবি কান্ডকারখানা! আইছো, দেখবা। পুরাই পাগল। তোমার নানা ভাইও সুবিধার মানুষ না। দুইবার ইস্ট্রোক কইরা একটু লাইনে আইছে। আর সালমা হইছে কাজের মাইয়া। ভাব লয় বড়লোকের মাইয়ার মতন। তার কাছে হাছা কথার বালাই নাই। কথায় কথায় মিছা কওন তার স্বভাব।"

মুহিত শুধু শুনে যাচ্ছে, তার মুখ হাসি-হাসি।

রিপন আবার বলল, "একটা জাগায় তোমার আমার মিল আছে। তোমারও মা নাই, আমারও নাই।" রিপন মেঝেতে বসা, মুখও মেঝের দিকে। মৃদু গলায় বলল, "মা নাই কথাডা পুরা সইত্য না। মা আছে, সৎ মা। তোমারও হইব একদিন। কিন্তু তারা আসল মা হয় না।"

রিপন ছলছল চোখ নিয়ে বলল, "আমার আম্মা বাইচা থাকলে, জীবনেও এই বাইত আইতাম না। হঠাৎ একদিন আম্মা মইরা গেল। আব্বা করল আবার বিয়া। তারপর থাইক্যা খালি আমার দোষ। নতুন আম্মাও কয় আমার দোষ, আব্বাও কয় আমার দোষ। মা নাই মানে দুনিয়াত কিছু নাই।"

রিপনের চোখ ভিজে উঠল। তারপর বলল, "ফুফু আমারে নিয়া আইলো। খালি ফুফুর কাছেই আম্মার আদর পাই।"

মুহিতের মুখে এখন হাসি-হাসি ভাবটা নেই।

"ফুফু খুব ভালা মানুষ, তুমি মার অভাব বুঝবা না।" চোখ মুছে রিপন বলল, "আজ বিকালে তোমারে আমি সময় দিতে পারতাম না। আমার একটা ক্রিকেট ম্যাচ আছে। কাইল থাইক্যা সময় দেমু।"

 বিকেল বেলা কাঁপুনি দিয়ে মুহিতের ঘুম ভাঙল। চোখ মেলে দেখল, সে একটা অচেনা রাজ্যে পড়ে আছে। এই রাজ্যের পরিচয় সে জানে না। বেশ কিছুক্ষণ সময় লাগল তার এই রাজ্যের পরিচয় জানতে। গত রাতে ভালো ঘুম হয়নি বলে বিছানায় শরীর রাখতেই ঘুমিয়ে পড়লেও ভালো ঘুম হয়নি। ভাসা ভাসা স্বপ্নে পড়েছিল, এলোমেলো ছেঁড়া ছেঁড়া স্বপ্ন। স্বপ্নে বাবা ছিল, এইটুকু ছাড়া আর কিছুই স্পষ্ট মনে পড়ছে না। আসার সময়ের বাবার অসহায় মুখটা বারবার স্বপ্নে ভেসে উঠছিল। বাবার কথা মনে পড়তেই মুহিতের বুক দুমড়ে-মুচড়ে কান্না আসে।

ঘুম জাগা বিকেলের একটা অদ্ভুত মায়া থাকে। সেই মায়ায় মুহিত উপুড় হয়ে শুয়ে কাঁদতে লাগল। শব্দহীন কান্নায় মুহিত পারদর্শী। অনেক দিন পর সে কাঁদছে। সে সময় বাবা-মা দুজনকেই মনে পড়ছিল। ঘরের আলো ক্রমশ কমে আসছে। আফরোজা বানু দু’বার এসে মুহিতকে ঘুমে দেখে গেছেন। এখন মুহিতের জন্য নানারকমের টিফিন তৈরি করতে ব্যস্ত আছেন। বাড়িতে এক প্রকার উৎসব বাঁধিয়ে দিয়েছেন তিনি।

মুহিত ফোলা ফোলা চোখ নিয়ে বারান্দায় এসে বসল। রেলিংয়ের জন্য চেয়ারে বসে সামনের কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। কিছুক্ষণ বসে থেকে আস্তে আস্তে বুকসমান রেলিংয়ের পাশে এসে দাঁড়িয়ে গেটের দিকে এমনভাবে তাকাল, যেন কেউ আসবে, তার জন্যই অপেক্ষা। তখন পাঁচিলের বাইরের রাস্তা দিয়ে একটি রিকশা ক্রিং ক্রিং শব্দ করে দ্রুত চলে গেল। কিছুক্ষণ পর পরই যাচ্ছে রিকশা, প্রাইভেট কার। এ সময় রিপনের মুহিতকে সময় দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার কোনো পাত্তা নেই। এই না থাকা অবশ্য পূর্ব নির্ধারিত।

শাওন নিঃশব্দে মুহিতের পাশে এসে দাঁড়িয়ে বলল, "কখন এসেছিস?" পরনে হাত ভাঁজ করা হলুদ পাঞ্জাবি।

মুহিত এক নজর দেখে শান্তস্বরে জবাব দিল, "সকালে।"

"সকাল এসেছিস, এই দেখলাম!" তারপর মুহিতের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, "বাবার জন্য কেঁদে চোখ ফুলিয়েছিস?"

শাওনের কথায় মুহিতের চোখ আবার ছলছল করে উঠল, ঠোঁট কেঁপে উঠল। ইচ্ছে করছিল আবার কাঁদতে। মুহিত নিজেকে সামলে নিল, কিন্তু কিছুই বলল না।

"আরেকটু কাঁদবি? কেঁদে নে। তোর কান্না করা যুক্তিযুক্ত। ছেলে বাবার জন্য কাঁদবে না তো কী শ্বশুরের জন্য কাঁদবে! নে, কান্না শুরু কর। কাঁদা ভালো, বুকের ভার কমে।"

কথাগুলো শাওন রসিকতা করে বলল। অথচ মুহিতের দিকে তাকাতে তার কষ্ট হচ্ছে। মাকে হারিয়ে যে ছেলেটা বাবাকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চেয়েছিল, সেই বাবাকেও ছেড়ে আসতে হয়েছে কতগুলো অচেনা অজানা মানুষের কাছে। সে কাঁদবে নাকি হাসবে!

শাওনের কথায় মুহিতের কান্না করার ইচ্ছে হারিয়ে গেল। শাওন আবার থেমে থেমে বলল, "কান্না করবি না? মনে হচ্ছে তুই কিছুটা হালকা হয়েছিস। দুইদিন পর দেখবি ঘুড্ডির মতো হালকা হয়ে গেছিস। হালকা হয়ে গেলে কান্না করার দরকার নেই। এবার বলতো আমি কে?"

মুহিত স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বলল, "শাওন মামা।"

"কী করে জানলি?"

"রিপন মামা বলেছে।"

"তুই আমাকে কখনো দেখেছিস?"

মুহিত মাথা নেড়ে না-সূচক জবাব দিল।

"শুধু শুনেই বুঝে ফেললি আমি শাওন মামা?"

মুহিত কিছু না বলে চুপ করে থাকে।

"রিপন আর কী বলেছে?"

মুহিত তখনও জবাব না দিয়ে চুপ করে রইল।

"আমি পাগল, হলুদ পাঞ্জাবি পরি — এইসব বলেছে তো?"

মুহিত মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, "হুঁ।"

"আমাকে দেখে তোর পাগল মনে হয়?"

মুহিত আবার মাথা নেড়ে বলল, "দেখে মনে হয় না।"

"ক’দিন থাকলেই বুঝতে পারবি। এই তো? তোর কি আমাকে ভয় লাগছে?"

"জানি না।"

"কয়দিনের জন্য এসেছিস রে?"

মুহিত আবার বলল, "জানি না।"

"না জানলেও কোনো সমস্যা নেই। এটা জানা জরুরি বিষয় না। চল এবার আমার ঘরে চল।"

মুহিত চমকিত চোখে শাওনের দিকে তাকাল। মুহিত সত্যি সত্যি ভয় পাচ্ছে। হাতে-পায়ে খিল লেগে যাচ্ছে। শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে শাওনের চোখের দিকে ঘন ঘন তাকাচ্ছে।

শাওন খেপাটে ভাব করে হাত শক্ত করে ধরে বলল, "চল বেটা। মামার ঘরে তুই যাবি না, তোর বাপ যাবে।"

একরকম জোর করে মুহিতকে নিয়ে রুমে ঢুকল। রুমে ঢুকে মুহিতের পিলে চমকে যাওয়ার অবস্থা! দিনের বেলায় সারা ঘর অন্ধকার করে উজ্জ্বল হলুদ ড্রীমলাইট জ্বালিয়ে রেখেছে। হলুদ ড্রীমলাইট দেখে পিলে চমকানোর কথা নয়। কিন্তু রিপনের পূর্বাভাস আর শাওনের আচরণ ভয় পেতে বাধ্য করছে। মুহিতের গলা ফাটিয়ে চিৎকার করতে ইচ্ছা করছে।

শাওন আবার গলার স্বর অস্বাভাবিক করে বলল, "এখন কী মনে হচ্ছে? রিপনের কথা বিশ্বাস না করে ভুল হয়েছে? আমারে হইলদ্যা ভূতে ধরেছে, তোকে রিপন বলেছিল না? বিশ্বাস করিসনি তো? এইবার দেখবি হইলদ্যা ভূত কারে বলে!"

ঘরের কোণা থেকে হাজার রকমের হইলদ্যা ভূত বের হয়ে আসবে। শাওন ভয়ংকর রকমের হাসি হাসল। হাসি থামিয়ে মুহিতের দিকে তাকাতেই দেখল মুহিতের চোখ বেয়ে পানি পড়ছে।

শাওন তাড়াতাড়ি আলো জ্বালিয়ে মুহিতকে জড়িয়ে ধরে বলল, "তুই সত্যি সত্যি ভয় পেয়েছিস? ধুর বোকা! আসার সময় শুনলাম, মা বলছিল তুই খুব বুদ্ধিমান। আমিও তো দেখলাম কিছু বুদ্ধি তোর আছে।"

মুহিত তখনও আতঙ্কিত হয়ে আছে। মুহিতের ভয় কমানোর জন্য শাওন বলল, "শোন শোন, রিপন সবাইকে বলে বেড়ায় আমি পাগল। আমাকে হইলদ্যা ভূতে ধরেছে। লোকেও তা বিশ্বাস করে। আমাকে দেখলে সাবধান হয়ে যায়। তাই তোকে পরীক্ষা করলাম। কী আফসোস! আমি পাগল, তুইও বিশ্বাস করলি!"

মুহিত কেঁপে কেঁপে নিঃশ্বাস ছাড়ল।

"এবার মনে হয় সত্যি সত্যি পাগলামি হয়ে গেল। আচ্ছা, তুই গল্পের বই পড়িস?"

মুহিত না-সূচক মাথা নাড়ল।

"পড়িস না!" মুহিতকে ভালোভাবে দেখে বলল, "তুই কোন ক্লাসে পড়িস?"

"থ্রিতে।"

"থ্রিতে! থ্রিতে পড়া বাচ্চারা গল্পের বই পড়া উচিত কি না ভেবে বলল, না পড়লে সমস্যা নেই। যদি পড়তে চাস, পড়তে পারিস। এই ঘরে যত বই আছে, তোকে ধরার অধিকার প্রদান করা হলো মামা-ভাগ্নে ক্ষমতাবলে।"

মুহিত বইয়ের আলমারির দিকে তাকাল। পুরো আলমারি হুমায়ূনময়। শাওনের জানা যত হুমায়ূন আহমেদের বই আছে, সকল বই সংগ্রহ করা হয়েছে। আর কোনো বই বাদ পড়েছে কিনা তা নিয়ে বড় চিন্তায় আছে।

মুহিতের জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে, পৃথিবীতে কী একজনই বই লেখে? প্রশ্ন গিলে খাওয়ার স্বভাব মুহিতের। এবার আলমারির মাঝের তাকে একটা মোটা বইয়ের উপর নজর পড়ল মুহিতের। বইটির নাম 'হিমু সমগ্র'। এই বইটিই গিফট করেছিল শর্মি। এর আগে পাঠ্যপুস্তকের বাইরে বই পড়ার তেমন নেশা ছিল না শাওনের। 'হিমু সমগ্র' পড়ার পর থেকে বাকি সব বই সংগ্রহ করা। নিচের তাকেও হিমু নামক বিভিন্ন বই। মুহিত একে একে নাম পড়তে লাগল — হিমু, এবং হিমু, হিমুর রূপালী রাত্রি, আজ হিমুর বিয়ে, হিমুর মধ্য দুপুর — এইরূপ অসংখ্য বই। এই বইগুলোর অনেকগুলোই হয়তো হিমু সমগ্রে রয়েছে। তবু আলাদা আলাদা কেন কেনা হয়েছে, কারণ অজ্ঞাত।

টেবিলে কিছু বই রাখা আছে। সেখানেও হিমু — হিমুর আছে জল, হিমুর হাতে কয়েকটি নীলপদ্ম, হিমুর নীল জোছনা ইত্যাদি। টেবিলের উপর পড়ে আছে 'ময়ূরাক্ষী' নামের আরো একটি বই। সম্ভবত আজ পড়া হয়েছে। মুহিত বইটি খুলে প্রথম পৃষ্ঠা পড়তে লাগল। এখানে কথায় সামান্য ভুল রয়েছে। গল্পের প্রথম পৃষ্ঠা হলেও বইয়ের পৃষ্ঠা নাম্বার ৯। গল্পের শুরুতে লেখা —

"এ্যাই ছেলে, এ্যাই!"

আমি বিরক্ত হয়ে তাকালাম। আমার মুখভর্তি দাড়িগোফ। পরনে চকচকে হলুদ পাঞ্জাবি।

মুহিত এতটুকু পড়ে থামল। কারণ সে সেই ছেলেটাকে দেখতে পাচ্ছে — এই ঘরে খাটে বসা। মুহিত শাওনের দিকে তাকিয়ে হাসল। হাসিতে তার দাঁত দেখা গেল না, মুখও প্রসারিত হলো না। শুধু উজ্জ্বল আভা দেখা গেল।

শাওন বলে উঠল, "পরতে ইচ্ছে করে হলুদ পাঞ্জাবি? থাক, তোর হলুদ পাঞ্জাবি পরে কাজ নেই। যার বাবার টাকা পয়সা নেই, তার হলুদ পাঞ্জাবি পরার দরকার নেই। যদিও আসল হিমুর বাবারও টাকা পয়সা ছিল না। হতদরিদ্র ছিল," — বলে শাওন ভাবনায় পড়ে গেল।

একজন হতদরিদ্র লোকের এত উদাসীন হওয়ার কারণ কী? চিন্তিত মুখ নিয়ে মুহিতের দিকে তাকিয়ে বলল, "কাল তোকে অন্য বই এনে দেব। রাজা রাণীর বই।"

মুহিতের দিন ভালোই কাটতে লাগল। পরের দিন শাওন রাজা রাণীর বই এনে দিল। রিপনের সাথে নিয়মিত খেলাধূলা করছে। আবার রাতে ঘুমানোর সময় নানির মুখে মায়ের গল্প শুনছে। তখন সে তার বাবাকে ভুলে যায়। তবে অবসর সময় বাবার জন্য দুঃখের ডালা সাজিয়ে বসে। বাবাকে মনে পড়ে। বাবার জন্য পরাণ পুড়ে। তখন চোখে পানি চলে আসে।


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

সুখ সুদূরে (প্রথম পর্ব) | বাংলা উপন্যাস | আশিষ কৃষ্ণমুখ

সুখ সুদূরে ( ২য় পর্ব) বাংলা উপন্যাস। আশিষ কৃষ্ণমুখ

সুখ সুদূরে (৪র্থ পর্ব) বাংলা উপন্যাস। আশিষ কৃষ্ণমুখ