সুখ সুদূরে – ( ১৬ম) পর্ব | বাংলা উপন্যাস। শর্মির বিয়ের প্রস্তুতি ও শাওনের ভেতরকার দ্বন্দ্ব
SEO মেটা বর্ণনা (Meta Description)
শর্মির কমলা শাড়িতে বিয়ের কার্ড হাতে, আপন ভুবনে শাওনের সাথে দেখা। শাওনের মাঝে অশান্তি ও মুহিতের কাছে ভবিষ্যতের কথা। পড়ুন "সুখ সুদূরে" সিরিজের ১৬ তম পর্ব, যেখানে প্রেম, দ্বন্দ্ব ও পারিবারিক আবেগ একসাথে গেঁথে আছে।
১৬ তম পর্ব
পরদিন বিকালে শর্মি এলো আপন ভুবনে।
শাড়ি পরে। কালো পাড়ে কমলা রঙের সুতির শাড়িতে চমৎকার দেখাচ্ছে তাকে।
ফর্সা কপালে তিলসম কালো টিপ পরেছে। সে এখন রহমান সাহেব আর আফরোজা বানুর সামনে বসে আছে। চোখে মুখে কনে দেখা লজ্জা। আফরোজা বানু শর্মির উপর থেকে চোখ সরাতে পারছেন না। ভেবে পাচ্ছেন না, মেয়েটা এত সুন্দর কেন? এই মেয়েটার সাথে শাওনের বিয়ে দেবেন বলে মনে মনে স্থির করে রেখেছিলেন, প্রথম যেদিন দেখেছেন সেদিন থেকে। কিন্তু এখন তিনি ভরসা পাচ্ছেন না। এমন সুন্দরী একটা মেয়ে ঘরের বউ হলে বেশ হতো ভেবে ছোট্ট করে নিঃশ্বাস ফেললেন।
শর্মি বলল, — আন্টি, শাওন কি বাসায় আছে?
—
— আছে, ওর ঘরে।
— আমি কি ওর ঘরে যেতে পারি?
—
— হ্যাঁ, যেতে পারো।
শর্মি আস্তে আস্তে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় ওঠে পর্দা সরিয়ে শাওনের ঘরে ঢুকল। শর্মিকে দেখে শাওন বিন্দুমাত্র অবাক হলো না। অবাক হয়েছে শর্মির পরনে হলুদ শাড়ি দেখে। শাওনও হলুদ পাঞ্জাবি পরিহিত, পায়ে ব্যান্ডেজ।
খুশিতে উদ্বেলিত কণ্ঠে বলল, — অবশেষে তুমিও হলুদ শাড়ি পরলে!
—
— মোটেই না, এটা হলুদ না, কমলা।
— যাই হোক, কমলা শাড়িতে তোমাকে চমৎকার লাগছে। হঠাৎ কমলা শাড়ি পরলে ঘটনা কী?
—
— ঘটনা কিছু না। আমার হবু বর বলেছে, তাই।
— তাহলে এখন থেকে সব সময় কমলা শাড়ি পরবে?
—
— সব সময় পরব কেন? যখন যখন সে বলবে, তখন তখন পরব। এখন তার সাথে দেখা করতে যাব, তাই পরেছি।
শর্মি ব্যাগ থেকে খয়েরি রঙের একটি বিয়ের কার্ড বের করে শাওনের দিকে এগিয়ে দিল।
— এটা কী!
—
— আমার বিয়ের কার্ড।
— তোমার বিয়ে!
—
— এতক্ষণ বলছি কী?
শর্মি ব্যাগ কাঁধে নিতে নিতে বলল, তুমি কিন্তু বিয়েতে আসবেই। তুমি এলে আমি খুব খুশি হব। যাই, আর দেরি করতে পারব না। ও অপেক্ষা করছে। তুমি যাবে আমার সাথে? তিনজনে একসাথে কফি খাওয়া যাবে। তিনজনে মিলে কফি খাওয়ার তোমার খুব শখ ছিল। যাবে? বিল নিয়ে ঝামেলা হবে না।
শাওন কোনো জবাব না দিয়ে কিছুই বুঝতে পারছে না এমন ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইল। তার ভ্রু কুঁচকে আছে, কপালের মধ্যখানে সব মাংস এসে জমেছে।
— বুঝেছি, তুমি যাবে না। আমার না গিয়ে উপায় নেই। যাই, আমাদের জন্য দোয়া করো। মহাপুরুষের দোয়া পেলে ধন্য হই। করবে তো? মোহমুক্ত মহাপুরুষ।
শর্মি দোতলা থেকে নেমে আফরোজা বানুর কাছে এসে থামল।
— চলে যাচ্ছ?
—
— জ্বি, আন্টি।
— এই তো এলে! বসো না, গল্প করি।
দোতলায় হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা শাওনের দিকে তাকিয়ে বলল, — আন্টি, আমার একটু তাড়া আছে, আমি যাই।
আফরোজা বানু একরকম জোর করেই শর্মিকে বসালেন। — তোমাদের যে কী এত ব্যস্ততা বুঝি না। খালি চঞ্চলতা! বসো, দু’চারটা কথা বলি।
আফরোজা বানু সালমাকে ডেকে নাস্তা দিতে বলে শর্মির ভরাট মুখের দিকে আবার তাকালেন। কমলা রঙের আভায় শর্মির মুখটা তখন স্বর্ণের মত চকচক করছিল। খুব আদর লাগছে।
— এবার বল, তোমার বাবা–মা কেমন আছেন?
—
— জ্বি, ভালো।
রহমান সাহেব বললেন, — তোমার বাবাকে আমার সালাম জানিয়ো।
— জ্বি, জানাব।
তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, — তুমি এখন কী করছ?
—
— ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এ বছরই এমবিএ কমপ্লিট করেছি।
— ভালো, খুবই ভালো।
আফরোজা বানু বললেন, — মাঝে মাঝে আসতে পারো না? সেই কবে একবার এসেছিলে, আর এলে আজ।
— জ্বি, আসব।
শাওন একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। শাওনের দিকে চোখ পড়তেই বলল, — আজ যাই, আন্টি।
— তুমি তো কিছুই খেলে না।
— আরেকদিন এসে খাব।
শর্মি চলে গেলে শাওন বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। সেখান থেকে গেট পর্যন্ত শর্মিকে দেখতে পাবে। আফরোজা বানু রহমান সাহেবকে বললেন, — মেয়েটা সুন্দরী, তাই না?
—
— সুন্দরী তো অবশ্যই, কিন্তু তুমি যা ভাবছ, সেটা কী সম্ভব? কোনো বাবা কী তার মেয়েকে আধপাগল একটা ছেলের সাথে বিয়ে দেবে?
রহমান সাহেবের প্রশ্নে আফরোজা বানুর মুখটা ঘোলাটে হয়ে উঠল। মুহিত তখন উঠানে খেলছিল।
শর্মি ডেকে বলল, — এই মুহিত, এদিকে এসো। মুহিত কাছে এলে জিজ্ঞেস করল, — বলো তো, তোমার নাম যে মুহিত, আমি কী করে জানলাম?
—
— মামা বলেছে।
শর্মি বিষম খেল। — মামা বলেছে, তুমি কী করে জানলে?
—
— এটা সহজ কথা, তুমি মামার বান্ধবী।
— আমি যে তোমার মামার বান্ধবী, এটা কে বলল?
মুহিত রিপনের মুখের দিকে তাকাল।
— আচ্ছা, তুমি যে মিষ্টি একটি ছেলে, এটা জানো?
মুহিত মাথা নাড়ল, — নাহ।
— ওমা! নিজেরটাই জানো না!
শর্মি মুহিতের হাতে চকলেট দিয়ে বলল, — তুমি এই চকলেটের চেয়ে মিষ্টি। আজ জানলে তো?
মুহিত এবার হ্যাঁ–সূচক মাথা নাড়ল।
— আচ্ছা, তুমি আর ক’দিন আছ?
মুহিতের মুখ মলিন হয়ে উঠল।
রিপন বলল, — হেতার বাপেরই দ খবর নাই।
— ও আচ্ছা। ঠিক আছে, আজ যাই, আবার দেখা হবে। সেদিন খুব মজা করব।
শাওনের মধ্যে আজ মহাপৌরুষিক ব্যাপারটা কাজ করছে না। এলোমেলো লাগছে সব। শর্মির বিয়ে তার বিশ্বাস হচ্ছে না। ফেলে রাখা মোবাইলটি খুঁজে হাতে নিল, তাতে তেমন কোনো কাজে এলো না। জানতে পারবে এমন বন্ধুদের ফোন নাম্বার ডিলিট করে দিয়েছে। শর্মির ফোন নাম্বার মুখস্থ। সে দীর্ঘক্ষণ বারান্দায় বসে থেকে ছাদে উঠল। অন্ধকার ছাদের পাকা ঠান্ডা বেঞ্চিতে সটান শুয়ে আকাশে তারা দেখছে। প্রায়ই দেখে, কিন্তু আজ তারার মাঝে কোনো রহস্য খুঁজে পায় না—শুধু শুধুই চেয়ে থাকা। এবার ওঠে গিয়ে রেলিঙে হেলে দাঁড়াল। তার মন জুড়ে একটা অশান্তির বান বইছে। ছাদে ওঠে রাতের শহর দেখার একটা আলাদা আনন্দ রয়েছে। ছাদ যত উঁচু হবে আনন্দ ততই বেশি। শাওন কম-বেশি কোনো আনন্দই পাচ্ছে না।
সে আবার বেঞ্চিতে বসল। মোবাইলটি বের করে শর্মিকে ফোন করল। কয়েকবার রিং হওয়ার পর ফোন ধরে শর্মি বলল,
—
— এখন থেকে রাতে ফোন দেওয়া নিষেধ। অন্যের বউ হতে চলেছি। আমাকে অন্য নারীদের মতো ভেবো না, পরকীয়া করব। পরকীয়া আমি পছন্দ করি না। বিয়ে করব একজনকে, কথা বলব অন্য পুরুষের সাথে!
—
— ও! তাহলে রেখে দেই?
—
— না, রাখার দরকার নেই। যখন ফোন দিয়েই ফেলেছ, তখন কথা শেষ করে রাখো।
— তোমার বিয়ে কবে?
—
— তোমাকে তো কার্ড দেওয়া হয়েছে। পড়োনি? ঠিক আছে, আমিই বলছি। আজ বুধবার। মাঝে বৃহস্পতিবার, শুক্রবার, বাদ জুম্মা—বিয়ে।
— তুমি কী সত্যি বিয়ে করছ?
—
— সে কি! বিয়ের কার্ড পর্যন্ত বিলি হয়ে গেল, তুমি জিজ্ঞেস করছ আমি বিয়ে করছি কিনা? অবশ্যই করছি। তোমার আধ্যাত্মিক ক্ষমতা কী অন্য কিছু বলছে?
শাওন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—
— এই বিয়েটা না করলে হয় না?
—
— বিয়ে করব না কেন? আর বিয়ে না করে আমি করবটা কী? আমার সন্ন্যাসিনী হওয়ার কোনো মনোবাঞ্ছা নেই।
— আমি বিয়ে করতে বারণ করিনি। বলেছি এই বিয়েটা।
— এই বিয়ের দোষ কী? ছেলে মদ, গাঁজা খায়—এমন খবর পেয়েছ? নাকি তোমার কাছে এর চেয়ে ভালো ছেলের সন্ধান আছে? আর সন্ধান দিয়েই কী হবে, বিয়ের কার্ড বিলি হয়ে গেছে।
শাওন চুপ করে রইল। শর্মি কয়েকবার ‘হ্যালো’ বলার পর শাওন শব্দ করল।
— কী হয়েছে তোমার?
—
— জানি না। তবে কষ্ট পাচ্ছি, একথা বুঝতে পারছি। তোমার বিয়ে আমার কষ্ট হচ্ছে কেন?
উভয় প্রান্তে নীরবতা নেমে এলো। নিরবতা ভেঙে শর্মি বলল,
—
— তুমি কিছু বলতে চাও?
—
— বলার কী কোনো সুযোগ আছে?
—
— যদি সুযোগ দেওয়া হয়, কী বলবে তুমি?
—
— তুমি আমাকে বিয়ে করবে?
শর্মি নাকে সুর তুলে বলল,
—
— করতে পারি, তবে আমার কিছু শর্ত মানলে।
শাওন শান্ত গলায় বলল,
—
— আমি জানি তোমার কী শর্ত। তাই হবে।
ফোন ছাড়ার পর শর্মি খিলখিল করে হেসে বলল,
—
— ছয় মাসে যা পারিনি, ১২০ টাকার বিয়ের কার্ডে পাঁচ ঘণ্টায় তা হয়ে গেল!
বড়লোকের শীত-গরম দুই নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকে। শীতে হিটার, গরমে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রের কল্যাণে। শাওনের কক্ষে দুটি যন্ত্রই আছে। আজকাল কোনোটাই ব্যবহার হয় না। মহাপুরুষদের বিলাসিতা মানায় না। বাইরে শীত পড়েছে, ঘরে অবশ্য তেমন শীত নেই। শাওন অর্ধনগ্ন হয়ে ধ্যান করছে। আজকের ধ্যানের বিষয়বস্তু জীবনের সার জানা। পাঞ্জাবি খাটের উপর পড়ে আছে। রাতে ঘুমানোর সময় যখন পাঞ্জাবি খুলে রাখা হয়, ঘরে তখন হলুদ ড্রিমলাইট জ্বালিয়ে রাখা হয়। সে সময় পুরো ঘরটিই তার কাছে হলুদ পাঞ্জাবি মনে হয়। হলুদের বাইরে গেলে মন ছোট হয়ে যায়। মনে হয়, হিমু হওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। এখনো হলুদ লাইট জ্বলছে। পুরো ঘর আবছা হলুদ।
দু’দিন ধরে মুহিত শাওনের সাথে ঘুমায়। শাওনের অদ্ভুত সব আচরণ দেখে ভাল লাগতে শুরু করেছে। গত পরশু রাতের ঢাকা দেখবে বলে খালি পায়ে শাওন ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর রক্তারক্তি অবস্থায় তিনজন লোক চ্যাংদোলা করে তাকে ঘরে দিয়ে গেছে। পেরেক ফুঁড়ে বেশ খানিকটা পা জখম হয়েছে। এইসব দেখে রহমান সাহেব কয়েকবার লাঠি নিয়ে তেড়ে এসেছেন। পিটিয়ে সব ভণ্ডামি বের করবেন বলে মুহুর্মুহু হুমকি দিলেন।
রিপন এগিয়ে এসে বলল,
—
— যহন কইছিলাম পাগলা গারদে দেওনের কথা তখন দিলে এতদিনে ভালা হইয়া যাইত। আমি কী যোগাযোগ করমু পাগলা গারদে?
রহমান সাহেব রিপনের পশ্চাৎ পদে ধপাস ধপাস করে দুই ঘা বসিয়ে দিলেন। সেই সময় রিপনের বিকৃত মুখ দেখে মুহিত ফিক করে হেসে ফেলেছিল।
মুহিত দরজা ধাক্কা দিয়ে কড়কড় শব্দ করে রুমে ঢুকল। শাওন পায়ের ব্যান্ডেজ নিয়েই ধ্যান করছে। কোনো রকম না নড়েচড়ে বলল,
—
— আয়।
কিছুটা সময় নিয়ে আবার বলল,
—
— ঘুমাবি না, আমার পাশে বসবি?
মুহিত অল্প কথায় বলল,
—
— ঘুমাব।
— উঁহু, তুই তো এখন ঘুমাবি না, বাবার জন্য কাঁদবি।
মুহিত কোনো শব্দ করল না।
— ঠিক বলেছি?
মুহিত এখনো শব্দ করল না।
— এদিকে আয়, আমার পাশে এসে বস।
শাওন পূর্বের মতো মেরুদণ্ড সোজা করে বসে থাকে। মুহিত এসে পাশে বসল।
— নে, চোখ বন্ধ কর। আর আমার মতো জীবনের সার সন্ধান কর। দেখবি, দুঃখ-কষ্ট বলে দুনিয়াতে কিছুই নাই। সব অভিলাষ। মানুষ ইচ্ছা করে দুঃখ-দুঃখ খেলা করে। মানুষ জানে সুখ-দুঃখ কোনটাই চিরস্থায়ী নয়, তবু মানুষ দুঃখী-দুঃখী মুখ করে চলে, আবার অতি সুখে সুখাহ্লাদি হয়ে ওঠে। যেমন তুই।
শাওন খানিকক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—
— আমি কি ঠিক বলেছি?
মুহিতের চোখ বন্ধ। কোনো শব্দ করছে না। চোখ বন্ধ করে সে মাকে দেখতে পাচ্ছে। মা ভাত মেখে তার পেছনে পেছনে ঘুরছে। মুহিত খেতে চাইছে না। মা তাকে বকছে। তার ভাবনা দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে। মায়ের সাথে রিকশায় করে স্কুলে যেতেও দেখছে। এবার বাবাকে দেখতে পাচ্ছে—তিন দিনের ক্ষুধা নিয়ে সটান শুয়ে আছে। বাবার জন্য তার বুকে বরফের মতো জমাট কষ্ট। বাবাও কী তার জন্য কষ্ট পায়, নাকি ভুলে গেছে—ভেবে মুহিত। কত দিন হলো বাবাকে ছেড়ে এসেছে। সে একবার দিন গুনে ফেলল—বাবা কবে আসবে!
শাওন আবার বলল,
—
— জবাব দিচ্ছিস না কেন?
—
— কী বলেছ?
—
— তোকে এতক্ষণ কী বললাম! আচ্ছা, এখানে বসেও বাবাকে ভাবছিস? তোর দ্বারা মহাপুরুষ হওয়া সম্ভব না। তুই জাগতিক মায়ায় আচ্ছন্ন। আর তোর বাবাকে ভেবে কোনো লাভ নাই। তোর বাবা এখন গাড়ির হেল্পার। কেন জানিস?
মুহিতের জবাবের অপেক্ষা না করে বলল,
—
— তোকে কাছে নেবে বলে।
শাওনের কথা শুনে মনে হতে পারে, সে কোনো আধ্যাত্মিক শক্তি লাভ করে ফেলেছে—ঘরে বসেই সব গড়গড় করে বলে দিতে পারে আরিফ কী করছে, কোথায় যায়। আসল খবর হচ্ছে, শাওন তার বন্ধু সাজেদের কাছ থেকে শুনেছে, আরিফ আজ দু’দিন ধরে গাড়ির হেল্পারের কাজ করছে। মহাপুরুষের পথে পা দিয়ে রেখেছে বলে হইচই বাঁধিয়ে দেয়নি। মহাপুরুষের নিকট জগতে ক্ষুদ্র-বৃহৎ বলে কিছু নেই—সব ঢেউহীন নদী জলের মতো সমান। সে মনে মনে স্থির করে রেখেছে, আর কয়েকটা দিন দেখে রহমান সাহেবকে বলে নারায়ণগঞ্জে তাদের যে টেক্সটাইল মিল রয়েছে, ওখানে ম্যানেজার পদে বসিয়ে দেবে।
শাওন মুহিতের দিকে তাকিয়ে বলল,
—
— হেল্পার শুনে মন খারাপের কিছু নেই। তোর বাবা বেশি দিন গাড়ির হেল্পার থাকবে না। অতি শীঘ্রই ভালো চাকরি পেতে যাচ্ছে—একেবারে ম্যানেজার পদে। আমি দিব্যচোখ দিয়ে তাই দেখছি। বলতো, কীভাবে এসব জানলাম? সব আধ্যাত্মিক শক্তির দ্বারা! বুঝলি?
মুহিত শুনে যাচ্ছে, কিছুই বলছে না।
— তোর বাবাকে নিয়ে একটা সিনেমা হলে কেমন হয় বলতো? সিনেমার নাম হবে ‘হেল্পার থেকে ম্যানেজার’।
মুহিত তখনো কিছু বলল না।
— তোর সাথে কথা বলে মজা পেলাম না। এবার তুই ঘুমাতে পারিস।
মুহিত শুয়ে পড়লে আবার তাকে টেনে তুলে বলল,
—
— আজকেই আমার সাথে তোর শেষ ঘুম।
মুহিত নির্বিকার শাওনের দিকে তাকাল।
— জানি, তুই জিজ্ঞেস করবি না কেন শেষ ঘুম। ভয় পেলি?
তারপর গলার আওয়াজ কমিয়ে বলল,
—
— কালকে এই ঘরে তোর মামি ঘুমাবে।
মুহিত আবার শাওনের দিকে চোখ তুলে তাকাল।
— তোর সাথে একটু আলাপ করি। তুই মানুষটা ছোট হলেও আমার ধারণা খুবই বুদ্ধিমান। বুদ্ধিমানের প্রধান লক্ষণ হলো, বুদ্ধিমানরা কথা কম বলে। তুইও কম কথা বলিস। তোর সাথে আলাপ করাই যায়।
— জানিস, এই জাগতিক জগতটার একটা মহাকর্ষণ আছে। তাই মানুষ চাইলেই মোহমুক্ত হতে পারে না। তোর মামি কী বলেছে জানিস? হিমু নাকি হওয়া যায় না। হিমুরা মাঝেমধ্যে বহু যুগ পর পর জন্মায়। কথা খুবই সত্য। আমাকে দেখ, অনেক চেষ্টা করেছি—ব্যর্থ।
সে কৃত্রিমভাবে লম্বা নিঃশ্বাস ছাড়ল।
— কাল আমার বিয়ে। হিমুরা কী বিয়ে করে? করে না। কিন্তু আমি করব।
হিমু কে বা কারা, মুহিত চিনেও না জানেও না। শুধু হিমু নামের কিছু বই আছে—এটুকু জানে। তাই কোনো প্রশ্নও নেই, জবাবও নেই।
শাওন আবার বলল,
—
— একটু আগে যে তোকে আধ্যাত্মিক টাইপের কথাগুলো বলেছি, সব জেনে-শুনে বলেছি। আমার আধ্যাত্মিক পাওয়ার-টাওয়ার কিচ্ছু নেই। আলাপ শেষ, এখন ঘুমাতে পারিস। কাল আবার সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠতে হবে। তোকে আমার বিয়ের সাক্ষী হতে হবে। বুদ্ধিমান ছেলে হবে আমার বিয়ের সাক্ষী। তবে বিয়ের আগে কাউকে কিছু বলা যাবে না।
মুহিত বলল,
—
— তোমার সাথে আমাকে যেতে দেবে না।
— আমি পাগল বলে?
মুহিত মাথা ঝাঁকিয়ে বলল,
—
— হুঁ।
শাওন হেসে বলল,
—
— কাল থেকে আমাকে আর কেউ পাগল বলবে না। সকালে ঘুম থেকে ওঠেই মনে করবি, এই হলুদ ড্রিমলাইট খুলতে হবে। হলুদ লাইট দেখলে তোর মামি ক্ষেপে যাবে। হলুদ বর্জন করে তাকে গ্রহণ করতে হবে—কড়া শর্ত।
পাঞ্জাবি হাতে নিয়ে বলল,
—
— এই বাড়িতে যে আমাকে সবচেয়ে অপছন্দ করে, তাকে এই পাঞ্জাবিটা গিফট করে দেব।
মুহিত শান্তস্বরে বলল,
—
— রিপন মামাকে
— গুড, ভেরি গুড। আবারও বুদ্ধিমান ছেলের পরিচয় দিলি। কাল থেকে হলুদ পাঞ্জাবি রিপনের।
SEO কীওয়ার্ড (Keywords)
-
সুখ সুদূরে পর্ব ১৬
-
শর্মির বিয়ে
-
শাওন ও শর্মি
-
বাংলা গল্প সিরিজ
-
পারিবারিক গল্প বাংলা
-
প্রেম ও দ্বন্দ্ব বাংলা গল্প
-
মুহিত ও শাওনের সম্পর্ক
-
বাংলা ছোটগল্প
-
বাংলা উপন্যাস পর্ব
-
বাংলা গল্প অনলাইন
📢 মন্তব্য করুন
এই উপন্যাসের পরবর্তী পর্ব পেতে “সুখ-সুদূরে” ব্লগটি নিয়মিত পড়ুন।
আপনার মতামত আমাদের অনুপ্রেরণা জোগাবে।

পরের পর্ব পড়তে চাই
উত্তরমুছুন