সুখ সুদূরে – ( ১৫ম) পর্ব | বাংলা উপন্যাস। আরিফের একাকীত্ব, রুনার স্মৃতির দহনের গল্প
(Meta Description)
সুখ সুদূরে সিরিজের ১৫তম পর্বে দেখা যায় আরিফের জীবনে রুনার অনুপস্থিতি, ক্ষুধার্ত রাতের নিঃসঙ্গতা এবং স্মৃতির যন্ত্রণা। পুরনো দিনের সুখ, ভালোবাসা আর হারানোর বেদনায় ভরপুর এই অধ্যায়টি পাঠককে গভীর আবেগে ভাসিয়ে নেবে।
সুখ সুদূরে: ১৫ তম পর্ব
সন্ধ্যা নেমেছে স্বরূপে।
আরিফ ঘরে ঢুকে আলো না জ্বালিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল।
তার জীবনে যে অন্ধকার নেমে এসেছে তা বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত হওয়ার নয়—এই হতাশা থেকে আলো না জ্বালিয়ে শুয়ে পড়ে।
ক্রমশ অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে। এখন সটান হয়ে বিছানায় শুয়ে আছে।
রুনা আরিফের হাত ধরে ঝাঁকিয়ে ঘুম ভাঙালো।
আরিফ পিটপিট করে রুনার দিকে তাকাচ্ছে।
— "অফিস থেকে এসেই শুয়ে পড়লে?"
রুনা কপালে হাত দিয়ে আরিফের শরীরের তাপমাত্রা মাপে।
— "জ্বরটর তো নেই। এসেই শুয়ে পড়লে কেন?"
অলস ভঙ্গিতে হাই তুলে আরিফ বলল,
— "প্রচন্ড খিদে পেয়েছে, তাই ভালো লাগছিল না।"
— "খিদে পেয়েছে ভালো কথা। এসে ফ্রেশ হবে তারপর কিছু খাবে। শুয়ে পড়লে পেট ভরবে? আর অফিসে নিয়ে যাওয়া খাবার খাওনি কেন?"
— "সময় পাইনি।"
— "সময় পাওনি! এত কী কাজ ছিল খেতে সময় পেলে না?"
আরিফ ভাবে—
আসলেই তো! এত কী কাজ ছিল? খাওয়ার সময় পেলাম না কেন?
ভেবে কিছুই পাচ্ছে না।
রুনা শাসনের কন্ঠে বলল,
— "হয়েছে, আর ভাবতে হবে না। চেঞ্জ করে ফ্রেশ হয়ে খেতে এসো। আজ তোমার প্রিয় টেংরা মাছ রান্না করেছি।"
— "বলো কী!"
আমি এখনি ফ্রেশ হয়ে আসছি বলে বাথরুমের দিকে গেল আরিফ।
বিলাতি ধনেপাতা দিয়ে টেংরা মাছের ঝোল আরিফের খুব পছন্দ।
রুনা টেবিলে খাবার সাজিয়ে বসে আছে।
আরিফ মুখ মুছে টাওয়েল চেয়ারে ঝুলিয়ে চেয়ার টেনে বসে পড়ল।
সারা সকাল গন্ধ আর সৌন্দর্য ছড়ানো ফুল যেমন রোদের আচে প্রাণ হারায়, তেমন একটা মুখ নিয়ে পাশের চেয়ারে বসে আছে রুনা।
আরিফের চোখ রুনার দিকে পড়তেই ভীষণ মায়া লাগে।
হালকা পিংক শাড়িতে তাকে চমৎকার লাগছে।
শাড়ির রং আর শরীরের রং মিশে একাকার।
যেন হাওয়াই মিঠাই।
আজ রুনাকে খুব সুন্দর লাগছে।
তবুও আরিফের মায়া হয়।
নতুন করে রুনার চোখের নিচে কালি পড়েছে।
গভীর চিন্তা হয়—শরীরে কোন কঠিন রোগ-টোগ বেঁধেছে কিনা।
রুনা বলল,
— "কি দেখছ হা করে?"
— "তোমাকে আজ খুব সুন্দর লাগছে।"
রুনা নিঃশব্দে মুখ প্রসারিত করে হেসে বলল,
— "কোনদিন আমাকে তোমার খারাপ লেগেছে বলো তো? গত নয় বছরে প্রতিদিনই কোন না কোন বিশেষণে বিশেষায়িত করেছ। আজ কী বলবে?"
— "হাওয়াই মিঠাই। তোমাকে আজ হাওয়াই মিঠাইয়ের মত লাগছে। হাওয়াই মিঠাই দেখলেই যেমন ছুঁতে ইচ্ছে করে—এখন তোমাকেও ছুঁতে ইচ্ছে করছে।"
বলেই আরিফ হাত বাড়ায়।
রুনা নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
— "হয়েছে। ছেলে বড় হয়েছে এখন—যখন তখন এইসব চলবে না।"
— "এটা কিন্তু মিথ্যে নয়, তুমি খুবই সুন্দরী, অনিন্দ্য, তুলনাহীনা।"
রুনা এবার শব্দ করে হেসে বলল,
— "কবি ঠিকই বলেছিলেন, 'ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়'। ক্ষুধা মনে হয় বেশি লেগেছে। পেটে ক্ষুধা নিয়ে সুন্দর কুৎসিত নির্ণয় করা যায় না। দেখ, আমার চোখের নিচে কালি পড়েছে। তারপরও বলছ আমি সুন্দরী! তুমি আবোল তাবোল বকছো বলে পাতে ডিমওয়ালা টেংরা মাছ তুলে দিল।"
আরিফ রুনার চোখের দিকে তাকিয়ে শঙ্কিত মনে বলল,
— "চিন্তার বিষয়। চোখের নিচে কালি..."
আরিফ ভাত মেখে মুখে তুলবে—
তখনই কে যেন বাহির থেকে দরজা ধাক্কাচ্ছে।
ঘন ঘন কলিংবেল বাজছে।
আরিফ ধচমচিয়ে জেগে উঠে পাগলের মত এদিক ওদিক তাকাচ্ছে।
রুনাকে খুঁজছে।
কোথায় গেল রুনা? এই তো খাবার রুমে ছিল!
সে দিকে তাকায়—খাবার ঘর অন্ধকার।
স্বপ্ন ভেঙে গেছে।
স্বপ্ন ভাঙ্গার জন্য কষ্ট হয়।
কিন্তু এই সময় কে তাকে বিরক্ত করল?
মেজাজ খারাপ লাগছে।
গালাগাল দিতে ইচ্ছে করছে বাইরের লোকটাকে।
অলস শরীরে আলো জ্বেলে দরজা খুলল।
দরজার বাইরে রকিব সাহেব।
আরিফ হকচকিয়ে গেল।
— "রকিব ভাই, আপনি?"
— "ভূত দেখছেন মনে হচ্ছে? আসার কারণ নেই নাকি?"
রকিব সাহেব ঠোঁটকাটা ও রসিক প্রকৃতির মানুষ।
— "না মানে..."
— "ঘুমাচ্ছিলেন? সুখী মানুষের কাজ। সুখী মানুষের হুটহাট ঘুম চলে আসে। আর যার বউ মরে সে তো ভাই মহাভাগ্যবান,"
বলেই হো হো করে হাসেন।
— "কী বলেন, ঠিক বলিনি?"
আরিফের খুব বিরক্ত লাগে।
জবাব দেয় না।
দরজায় দাঁড়িয়ে কথা হচ্ছে।
রকিব সাহেব দেখেন আরিফ তাকে ঘরে যেতে বলছে না।
— "বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখবেন? ভিতরে যেতে বলবেন না?"
— "ও আচ্ছা, ভিতরে আসেন।"
ঘরে ঢুকে রকিব সাহেব এদিক ওদিক তাকিয়ে বললেন,
— "ঘরে মেয়ে মানুষ না থাকলে যা হয়। মেয়ে মানুষ ছাড়া সংসার হয় না। কী সাহেব, করবেন নাকি আরেকটা বিয়ে?"
আরিফ নির্বিকার বিরক্ত মুখে দাঁড়িয়ে থাকে।
রকিব সাহেবের দৃষ্টি আজ বড় চঞ্চল।
— "অফিসে আপনাকে নিয়ে নানাজন নানা কথা বলে। শুনতে ভালো লাগছিল না, তাই খবর নিতে আসলাম। তা ভালো আছেন?"
— "আছি।"
খাটে বসতে বসতে খেয়াল করলেন,
— "আচ্ছা এখানে সোফা ছিল না?"
— "জি, ছিল।"
— "লোকজন থেকে টাকা এনেছেন দিচ্ছেন না, দেখাও করছেন না। লোকজন তো কথা বলতেই পারে, তাই না?"
— "পারে।"
— "আমার কথা বাদ দেন। আপনি এখন কী করছেন?"
— "কিছুই না।"
— "চলছেন কীভাবে? আপনার হাতে তো টাকা পয়সা থাকার কথা না।"
এই প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে আরিফের ঠোঁট ভেঙ্গে আসে।
নাক ফুলে ওঠে।
চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে।
— "সোফা কী করেছেন বললেন না তো?"
— "বিক্রি করে দিয়েছি।"
— "বিক্রি করে দিয়েছেন!"
— "সোফায় কে বসবে?"
বলতেই গলা ধরে আসে আরিফের।
রকিব সাহেব উপলব্ধি করলেন—ঘরটা বেশ ফাঁকা।
— "আপনার ছেলের কথা ভুলেই গিয়েছি... মুহিত কোথায়?"
এই প্রশ্নে আরিফ নিজেকে সামলাতে ব্যর্থ হয়।
কে যেন গলায় চেপে ধরে আছে।
দুই হাতে মুখ ঢেকে কাঁদতে শুরু করে।
শিশুর মত কাঁদছে।
— "আরিফ সাহেব, কী হয়েছে? আপনি কাঁদছেন কেন?"
কোন জবাব নেই।
রকিব সাহেব চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকেন।
তাকে কখনো কাঁদতে দেখেননি।
— "আমার কথায় কষ্ট পেয়েছেন? আমি দুঃখিত ভাই..."
গভীর অপরাধবোধে নিচের দিকে ঝুঁকে বসে থাকেন।
অনেকক্ষণ পর আরিফ নিজেকে নিয়ন্ত্রণে আনল।
চোখ ফুলে রক্তজবা ফুলের মতো।
সব শুনে রকিব সাহেব বাক্যহীন।
সান্ত¡নার কোন ভাষা নেই।
— "আপনি একটা মানুষ ভাই! এতকিছু হয়ে গেল, আমাকে জানালেন না! আমি কী খুব খারাপ মানুষ? আপনার ভাবী আপনাদের কত পছন্দ করে জানেন? একটুও যোগাযোগ রাখলেন না!"
— "মোবাইল সিমটাও বন্ধ করে রেখেছেন..."
চুপচাপ কিছুক্ষণ পাশে বসে বললেন,
— "হাতে টাকা পয়সা কিছু আছে?"
আরিফ মাথা নাড়ে।
না।
— "টাকাটা রাখেন।"
এক হাজার টাকার নোট বের করে পকেটে গুঁজে দিলেন।
— "ভাই, আমি টাকা নিতে পারব না..."
— "কে দিব্যি দিয়েছে? নিন, দয়া করেছি ভাববেন না। ফেরত নেব।"
“এখন রাখেন,” বলে রকিব সাহেব টাকাটা আরিফের পকেটে গুঁজে দিলেন।
তিনি বেরিয়ে গেলে আরিফ ধীরে ধীরে বেসিনের আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। চোখ-মুখ শুকিয়ে উঠেছে। চোয়াল চেপে আছে, গলা কাঠের মতো শুষ্ক। চোখে-মুখে এক পশলা পানি ছিটিয়ে দিতেই শরীরটা হঠাৎ বিছানার জন্য কাতর হয়ে উঠল। কিন্তু রাতে খাওয়ার কিছু নেই। পানি খেয়ে শুয়ে পড়া ছাড়া উপায়ও নেই। সে-ই করল।
ঘুম আসছে না। খালি পেটে ঘুম আসে না। আজ তো আরওই আসবে না। অন্ধকারে পা টিপে টিপে বারান্দায় গিয়ে বেতের চেয়ারে বসে পড়ে আরিফ। আজকাল অন্ধকারকে খুব ভালো লাগে তার। আলোতে অন্ধকার লাগে, আর অন্ধকারকে ঝলমলে আলো মনে হয়। অন্ধকারে সে দেখতে পায় তার ফেলে আসা সুখের দিনগুলো।
বারান্দার দিকটা বেশ খোলামেলা। নিচে ঘন কচুবন। প্রথম প্রথম এই বাসায় ওঠার সময় নিচে ছিল টলটলে এক পুকুর। এখন সেখানে কচুবন। শহরের সভ্য মানুষদের অসভ্যতায় কবে যে যৌবনা পুকুরটি মরে গেল, কেউ টেরও পেল না। সেই পুকুরের মৃত্যুতে রুনা খুব কষ্ট পেয়েছিল।
আজ আকাশে চাঁদ নেই। অমাবস্যা কেটেছে সবে, প্রতিপদ লেগেছে। নিভৃত কোনো পল্লী হলে রাতটা হতো ঘুটঘুটে কালো। কিন্তু শহরের আলো-আধারির খেলায় প্রকৃতির স্বাভাবিকতা প্রায় বিলুপ্ত। চারপাশের বৈদ্যুতিক আলো আবছা করে রাখে অন্ধকারকে।
আরিফ রেলিং ধরে সামনের দিকে ঝুঁকে আকাশের তারা দেখছে। মানুষ মরে গেলে আকাশের তারা হয়ে যায়—এই কথার ভিত্তি সে জানে না, কিন্তু বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে। তারার ভিড়ে খুঁজছে একটি তারা— যার নাম ‘রুনা’। কিন্তু খুঁজে পায় না। আবার চেয়ারে বসে পড়ে।
এই বারান্দা তার খুব স্মৃতিময়। রুনার সাথে প্রথম রাত এখানে কেটেছিল। তখন এই চেয়ার ছিল না, দুজনে মেঝেতে বসেই জীবনের নানা পরিকল্পনা করেছিল। সেদিন ছিল পূর্ণিমার ঝলমলে চাঁদনী রাত। পুকুরের পানিতে চাঁদ আর তার প্রতিচ্ছবি মিলে মনে হয়েছিল পৃথিবীতে তিনটি চাঁদ নেমে এসেছিল—তৃতীয় চাঁদটি ছিল রুনা।
সেই রাতে রুনা তার পাশে বসে চাঁদের দিকে তাকিয়ে গান ধরেছিল—
“তুমি একটু কেবল বসতে দিয়ো কাছে
আমায় শুধু ক্ষণিকের তরে...”
আরিফ ভেবেছিল—এমন অপূর্ব মেয়ে তার মতো ছাপোষা আরিফের মাঝে কী দেখল? তার নিজের অযোগ্যতা নিয়ে সংকোচে ছিল সে। কিন্তু রুনা ছিল সরল হৃদয়ের, অদ্ভুত রকম ভালবাসার মানুষ।
পুকুরপাড়ের কলামুড়া থেকে একজোড়া বাদুড় উড়ে যেতে রুনা ভয়ে ‘ওমা গো’ বলে আরিফের বুকে মাথা গুঁজে দিয়েছিল। সেই স্মৃতি মনে করে হঠাৎ হাসি পায় আরিফের। হাসতে হাসতেই আবার কষ্ট ফিরে আসে।
রুনা বলেছিল,
—“তুমি ভয় পেয়ো না। বিলাসিতার সবকিছু থাকলেও আমি কখনও বিলাসী ছিলাম না। তুমি যে সেলারি পাবে, তাতেই হেসে খেলে দিন চলে যাবে।”
আরিফ মুচকি হেসে বলেছিল,
—“সত্যি আমি খুব ভাগ্যবান। তোমাকে পেয়েছি।”
মশার কামড়ে চেতনা ফিরে আসে আরিফের। ক্ষুধায় পেট গর্জন করছে। ভাবছিল, এখানেই রাত কাটাবে, কিন্তু মশা তাতে বাধ সাধে। উঠে সামনে এগুতেই গায়ের ধাক্কায় মুহিতের সাইকেলটা পড়ে যায়। শব্দটি তার হৃদয়ে ঝড় তোলে। রুনার মৃত্যুর পর আর মুহিত সাইকেল চালায়নি।
সাইকেল ছুঁয়ে মনে হয় ছেলেটাকে ছুঁচ্ছে। ফিসফিসিয়ে বলে—
—“কেমন আছিস রে বাবা? রাগ করিস না তো? আমারও তোকে ভীষণ দেখতে ইচ্ছে করে। কিছু একটা ব্যবস্থা করেই তোকে নিয়ে আসব, ঠিক করব।”
তার চোখে তখন অঝোর অশ্রু।
অন্যদিকে, আফরোজা বানু মুহিতকে বুকে নিয়ে শুয়ে আছেন। মুহিত চিৎ হয়ে আছে। অন্ধকারে তার চোখে জ্যোতি জ্বলজ্বল করছে। চোখের পানি গড়িয়ে কানের পাশ দিয়ে বালিশে নেমে গেছে।
আফরোজা বানু আলোর সুইচ চাপলেন।
—“তুমি কাঁদছ দাদুভাই?”
মুহিত মাথা নাড়ল।
—“এই যে বালিশ ভিজে গেছে...”
নিচু স্বরে বলল,
—“আমার ঘুম না হলে চোখ থেকে পানি পড়ে।”

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন