সুখ সুদূরে ( ৫ম পর্ব) বাংলা উপন্যাস আশিষ কৃষ্ণমুখ

📝 Meta Description: রুনার জীবনের শেষ দিনগুলির এক মর্মস্পর্শী কাহিনী এই পর্বে ফুটে উঠেছে। 

 
🔑 Focus Keywords: বাংলা উপন্যাস, সুখ সুদূরে জীবনমুখী গল্প, ব্রেইন টিউমার গল্প, মায়ের অসুস্থতা, পরিবারিক গল্প, Bangla story, emotional bangla story, realistic bangla golp 

 
সুখ সুদূরে ৫ম পর্ব 

প্রথম থেরাপি শেষ করে রুনাকে যখন কেবিনে দেওয়া হয়, আরিফের হাত ধরে চোখে চোখ রেখে রুনা বলল,
 — আমার মরণব্যাধি হয়েছে, তাই না? সে সময় রুনার চোখেমুখে ভীষণ মায়া ফুটে উঠেছিল। এমন মুখের দিকে নিরবধি তাকিয়ে থাকা যায় না। চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করে। 

আরিফ একবার রুনার মুখের দিকে তাকিয়ে দ্রুত চোখ সরিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল, — কিছু হয়নি। তোমার থেরাপি সফলভাবে হয়েছে। ডাক্তার বলেছে এটা ভালো লক্ষণ। এভাবে সবগুলো হলে আর কোনো ভয় নেই।
 — আর যদি পরের থেরাপিগুলো ঠিকঠাক নিতে না পারি?
 — পারবে। তুমি উল্টোপাল্টা কথা ভাবো না, প্লিজ। আমার বিশ্বাস, তুমি খুব দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবে। 
রুনা চোখের কোণ মুছে বলল, — আর বলব না। এবার বলো, চিকিৎসার টাকা কোথায় পেয়েছ? 
আরিফ মাথা নিচু করে বলল, — তোমার স্বপ্নে হাত দিয়েছি। 
— মানে! ফ্ল্যাটের জন্য তিলেতিলে করে জমানো টাকা তুমি ভেঙে ফেলেছ? 
— তোমাকে নিয়ে ভাড়া বাসায় আজীবন থাকতে আমার কোনো কষ্ট নেই, রুনা। 
রুনা বলল, — আমি জানি আমার শেষ পরিণতি কী হবে। তুমি আমার ছেলের ভবিষ্যৎ নষ্ট করো না। 
 —টাকা মানুষ প্রয়োজনের জন্য সঞ্চয় করে, রেখে দেওয়ার জন্য নয়। এটা নিয়ে তুমি আর কথা বলো না। 
শান্ত স্বরে রুনা জানতে চাইল, — মুহতি কোথায়? 
— রকিব ভাইয়ের বাসায়। — ও কি সব জানে?
 — হুঁ। 
— ও যে কিছু বলল না আমাকে!
 — আমিও ভাবছি, ক’দিনেই যেন অনেক বড় হয়ে গেছে এমন ভাব করছে ছেলেটা। 
রুনা বলল, — একটা কথা বলি? 
— বলো। 
— আমার যদি কিছু হয়ে যায়, আমার ছেলেটাকে তুমি দেখো। যেন সে আমার অভাব কোনো দিন অনুভব না করে। তোমার কাছে এটাই আমার চাওয়া। রুনা কেঁদে ফেলল। 
আরিফের চোখও ভিজে উঠল। নিজেকে সামলে বলল, — তোমাকে বলেছিলাম, আগ বাড়িয়ে এইসব কথা বলবে না। ডাক্তার বলেছে তুমি ভালো হয়ে যাবে। 
রুনার আরও অনেক কথা বলার ছিল। না বলে বুক ফুলিয়ে নিঃশ্বাস ছাড়ল। 
আরিফ বলল, — তোমাকে একটা কথা বলব?
 — বলো। 
— পৃথিবীর প্রতিটি বাবা-মা তার সন্তানকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে, স্বপ্নের মতো করে বড় করে। যখন সন্তান সেই স্বপ্ন ভেঙে দেয়, তখন অভিমান হওয়াটাই স্বাভাবিক। এটা অন্যায় কিছু না। আমি কী বলছি, তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছ?  আব্বা-আম্মাকে খবর পাঠাব? 

রুনা যেন নিজের অজান্তেই বলল, — না।  বাবা আমাকে ঘৃণা করে, ঘৃণা নিয়েই থাকতে দাও। কারো প্রতি ঘৃণা থাকলে তার জন্য কষ্ট হয় না। ঘৃণাই আপনজনকে ভুলে থাকার একমাত্র উপায়। রুনা মনে মনে বলল, এখন তাদের অভিমান ভাঙাতে চাই না। সব জানলে খুব কষ্ট পাবে। 
আরিফ বলল, — ঘৃণা বলছো কেন? ঘটনার প্রেক্ষিতে রাগ করেছে। আব্বা-আম্মাকে দেখতে ইচ্ছে হয় না?
 — আমাকে পাথরের মতো মনে হয়? রুনা জিজ্ঞেস করল।
 — তা বলিনি। 
তারপর রুনা বলল, — আমি যে বাবা-মাকে দেখেছি, জানো?
 — না তো! একথা কখনো বলোনি তো? 
— স্বপ্নে দেখেছি। গত পরশু রাতে। দেখলাম বাবা-মা আমাদের বাসায় এসেছে। কিন্তু আমার সাথে দেখা হয়নি। আরিফ রুনার চোখের দিকে তাকাল। 
রুনা আবার বলতে লাগল, — মা আগের মতোই আছেন, কিন্তু বাবাকে চিনতে পারছিলাম না। খুব বয়স্ক লাগছিল। নিঃতেজ, রোগা। বাবা সম্ভবত দাড়ি রেখেছেন। ধবধবে সাদা চুল আর দাড়ি। 
আরিফ বলল, — সময় তো আর কম গড়ায়নি। নয় বছর! 
রুনা আবার বলল, — আমার মন বলছে বাবা-মা আসবে, দেখবে। একদিন সকালে এসে হাজির হবে।
 
— আসাই তো উচিত। তারপর ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আরিফ বলল, — রাত অনেক হয়েছে। নিচে গিয়ে কিছু খেয়ে আসি, তোমার কিছু ওষুধও লাগবে। 

 আরিফ ওষুধ আনতে চলে গেলে রুনা বিছানা ছেড়ে জানালার পাশে এসে দাঁড়ায়। উপর থেকে রাস্তার গাড়িগুলোকে আকারে খুব ছোট দেখায়। লাইনে চলা ধীরগতির গাড়িগুলোর হেডলাইট যেন ঝাড়বাতির মতো, আর উপর থেকে নিচের নীরবতা গভীর মায়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। 

পৃথিবীকে আজ তার কাছে গভীর রহস্যপুরী মনে হয়। দুই দিনের এই দুনিয়া, অথচ মানুষ দুনিয়া ছেড়ে যাওয়ার কথা ভুলে গিয়ে চরম সুখে থাকার কত আয়োজন করে বসে। ছুটে চলা গাড়ির দিকে মনোযোগ দিয়ে মনকে প্রশ্ন করে, অকারণে কেন এই ছুটে চলা? নিরন্তর এই ছুটে চলা কি শুধু বাঁচার জন্য? হয়তো। কিন্তু পারবে কী বাঁচতে? হঠাৎ করে আরিফের মুখটা ভেসে উঠল। কী দৌড়টাই না দৌড়াচ্ছে বেচারা! ইটভাটার চুল্লির মতো ভিতরে ভিতরে জ্বলে ছাই হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু একটা কঠিন আবরণে ঢেকে আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে যাচ্ছে, বাঁচার অলীক স্বপ্ন দেখাচ্ছে। 

রুনা মনে মনে বলল, "আমি জানি আরিফ, আমি আর বাঁচব না। থেরাপি পর্যন্ত গিয়েও ক’জন ফিরে এসেছে? আর কতদিনইবা বেঁচেছে? আমাকে মরতে হবে খুব তাড়াতাড়ি। এটাই আল্লাহর ইচ্ছা। তুমি যতই লুকিয়ে রাখো, এটা জানো না আরিফ, আমি যখনই তোমার মুখের দিকে তাকাই, তখনই মরে যাই।" একজন চমৎকার, শক্ত পুরুষ যখন শুকনো, মলিন মুখে ঘোরে বেড়ায়, তার মনে কী হচ্ছে তা সহজেই অনুমেয়। ভেবেছ আমি কিছুই বুঝি না? 

"আমার না থাকায় তুমি খুব কষ্ট পাবে, হয়তো সারা জীবন তোমার স্মৃতিতে আমি থাকব। আবার একদিন সব স্বাভাবিকভাবে নতুন কাউকে হয়তো তোমার জীবনে আনবে। তাতে আমার কোনো আপত্তি নেই।" "কিন্তু আমার ছেলেটার কী হবে? ওর কী মায়ের অভাব ঘুচবে? নাকি বুকভরা কষ্ট নিয়ে মানুষ অথবা অমানুষ হবে? এই বয়সে মা নামের মানুষটি শুধুই স্মৃতি হতে যাচ্ছে। আনমনে খুঁজে যখন আমাকে পাবে না, — এই ব্যথা কীভাবে সইবে?" রুনার বুক ভেঙে কান্না আসে। মৃত্যুকে মেনে নেওয়া সকল প্রাণীর জন্য দুঃসাধ্য কাজ। রুনারও বাঁচতে বড় ইচ্ছে করে। আল্লাহর কাছে বাঁচার প্রার্থনা করে। 

মানুষের ভাবনাগুলো দ্রুত বদলায়। রুনার সমস্ত মনজুড়ে এখন বাবা-মা আশ্রয় নিয়েছে। বাবা-মাকে দেখতে বড্ড ইচ্ছে করে। অথচ আরফিকে দিয়েছে ভিন্ন যুক্তি। ইচ্ছে করে ছুটে গিয়ে তাদের পা ধরে ক্ষমা চায়। চোখের জল কখন যে গাল বেয়ে নেমে গেল, রুনা বুঝতে পারল না। আঁচল দিয়ে মুখ মুছল। "মেয়ের অসুখের কথা শুনলে বাবা-মা নিশ্চয়ই ছুটে আসবে। এসে বিদেশে নিয়ে চিকিৎসা করাতে চাইবে।" এটা আরিফের জন্য অসম্মানের হবে—এই ভেবে এতদিন যোগাযোগ করেনি। শেষ সময়েও আর করতে চায় না। 

"শাওনটা মনে হয় অনেক বড় হয়ে গেছে। দেখতে কেমন হয়েছে শাওন? নিশ্চয়ই সুন্দর হয়েছে। এমনিতেই তো খুব সুন্দর ছিল। আচ্ছা, ও কেন আমাকে খুঁজে বের করল না? ও কি এখনো আগের মতোই অলস? অলসতার চাদরে মুড়ে বোনকে খোঁজার ইচ্ছেশক্তিটাও হারিয়ে ফেলেছে?" শাওন রুনাকে খুঁজে বের না করার কারণ অজ্ঞাতই রয়ে গেল। 

কিন্তু রুনা চলে আসায় সবচেয়ে বেশি কষ্ট শাওনই পেয়েছিল। কারণ রুনা ছিল তার সবচেয়ে বড় সহায়ক বন্ধু ও বোন। রুনা চলে গেলে হঠাৎ সে একা হয়ে পড়ে। অনেক কাজেই রুনার জন্য আনমনে অপেক্ষা করত। কিন্তু রুনা আর ফিরে আসেনি। সকলের অগোচরে সেই মানসিক অবসাদ তাকে দীর্ঘদিন ভুগিয়েছে। 

 আরিফের এখন মনে হচ্ছে শেষ থেরাপিটা না দিলে হয়তো এমন হতো না। কারণ সে স্বপ্ন দেখেছিল রুনা আগের মতো সুস্থ হয়ে গেছে। রুনা লাইফ সাপোর্টে যাওয়ার দিন ভোরবেলা চেয়ার-এ বসে মাথা ঝুঁকিয়ে ঘুমাতে ঘুমাতে আরিফ স্বপ্ন দেখল, রুনা তার অফিসে যাওয়ার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করছে। মুহতিকে স্কুলে নিয়ে যাচ্ছে। 
ঘুমঘোরেই আরিফের মনে পড়ল—রুনা অসুস্থ। 
— তুমি তো অসুস্থ! রুনা কপট হেসে বলল, 
— কে বলেছে আমি অসুস্থ? আমি তো তোমার সাথে দুষ্টুমি করছিলাম! চেয়ে দেখো, আমি পুরোপুরি সুস্থ! আরিফের দারুণ সুখানুভূতি হলো। সেই রেশ থেকে যায় জেগে উঠার পরও অনেকক্ষণ। রুনাকে সুস্থ দেখছিল। শুকরিয়া আদায় করে বলল, — আল্লাহ, স্বপ্নটা যেন সত্যি হয়। 

সকালে তায়েবা বেগম মুহতিকে নিয়ে হাসপাতালে এলো। থেরাপিতে যাওয়ার আগে মুহতিকে কাছে ডেকে রুনা জিজ্ঞেস করল, — বাবার কাছে থাকতে ভালো লাগে? 
— আজ বাবার সাথে ছিলাম না। 
— যখন থাকিস? 
মুহতি মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, — হুঁ, লাগে। 
— মা না থাকলে অসুবিধা হয় না? 
— হয়। রুনার ভেতরটা মুচড়ে উঠল। মুহতিকে বুকে চেপে ধরে দুই মাসের অনিয়মে লতার মতো বেড়ে ওঠা ঝাঁকড়া চুলে বারবার আঙুল ঢুকিয়ে বিলি করতে লাগল।  সিস্টার এসে তাড়া দেওয়ায় আর কোনো কথা হলো না। 
আরিফের তখন খুশি খুশি লাগছিল। এই থেরাপিটা ভালোভাবে হয়ে গেলে রুনা সুস্থ হয়ে যাবে—স্বপ্নে সে সেই ইঙ্গিত পেয়েছে। হয়েছে তার বিপরীত। 
থেরাপি শেষে অবস্থার অবনতি হলে রুনাকে লাইফ সাপোর্ট দিতে হয়। গতকাল থেকে কিডনি ও ফুসফুস কাজ করছে না। যে কোনো সময় একটা খারাপ কিছু ঘটবে বলে ডাক্তার জানিয়েছে। 
আরিফ ডাক্তারদের কথা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। 
"প্রদীপের সঙ্গে মানুষের জীবনের কি কোনো সাদৃশ্য আছে?" 
আরিফ মিল খুঁজে পায়। প্রদীপ যেমন নিভে যাওয়ার আগে ধপ করে জ্বলে ওঠে, মানুষও তেমনি। শেষ ক’টা দিন রুনা বেশ সুস্থ ছিল। 
সিসিইউ থেকে গাউন পরা একজন নার্স বেরিয়ে এসে বলল, 
— রুনা ইসলামের আত্মীয়-স্বজন কে আছেন? 
রকিব সাহেব আরফিকে বসিয়ে রেখে নিজে এগিয়ে গেলেন। — কী হয়েছে বলুন? 
— আপনি রুনা ইসলামের আত্মীয়? 
— জি। 
— — দুঃখিত, রুনা ইসলাম আর নেই। আমরা তাকে আর বাঁচাতে পারিনি।"
 রকিব সাহেব চোখ বন্ধ করে টেনে নিঃশ্বাস ছাড়লেন। তারপর আরিফের কাছে ফিরে এলেন। 
আরিফ নিচের দিকে তাকিয়ে বলল, — রুনা আর নেই, এই তো? 
রকিব সাহেব আরিফের কাঁধে শক্ত করে ধরে বললেন, — মুহতিকে সামলাতে হবে। আপনি পাগলামি করলে কষ্ট হয়ে যাবে। আমি ঐ দিকটা দেখি। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে বললেন, — চার লাখ। টাকার ব্যবস্থা কী?
 — যা ছিল সব শেষ।  আমার কাছে এখন দেড় লাখ আছে। 
— বাকিটা?
 — আমি জানি না ভাই। মাথা কাজ করছে না। রকিব সাহেব কোথায় কোথায় ফোন করে টাকা জোগাড় করে রুনার লাশ নিয়ে গেলেন। ;

📌 উপন্যাসের পরবর্তী পর্ব পেতে “সুখ-সুদূরে” ব্লগটি নিয়মিত পড়ুন। মন্তব্য করুন। আপনার মতামত আমাদের অনুপ্রেরণা জোগাবে।পরবর্তী পর্ব শীঘ্রই প্রকাশ করা হবে।

মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন