সুখ সুদূরে – ( ১২ম) পর্ব | বাংলা উপন্যাস। মুহিতের বিদায় ও আরিফের নিঃসঙ্গতার গল্প
Target Keywords: "মুহিত ও আরিফের সম্পর্ক", "বাবা ছেলের সম্পর্ক", "বাংলা গল্প সম্পর্ক", "সন্তান বিদায়", "মানবিক গল্প", "স্নেহ ও ত্যাগ"
Meta Description (উদাহরণ):“আরিফ ও মুহিতের আবেগঘন বিদায়ের গল্প। বাবা-ছেলের সম্পর্ক, ত্যাগ আর বাস্তবতার টানাপোড়েনের একটি মানবিক চিত্র। পড়ুন ১২তম পর্ব।”
১২ তম পর্ব: মুহিতের বিদায় ও আরিফের নিঃসঙ্গতা
যখন থেকে বনানীতে ফোন করার কথা শুনেছে, তখন থেকেই মুহিত স্তব্ধ হয়ে বসে আছে। একটি শব্দও করছে না। একইভাবে দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বারান্দায় বসে কাটিয়েছে। সে অভিমানভরা চোখে আড়াআড়ি বাবার দিকে তাকায়। তার সেই কাতর দৃষ্টিতে আরিফের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়, তবু একমনে ছেলের কাপড় গুছিয়ে যায়। যেন মুহিতের এই চাহনিতে তার কিছুই যায় আসে না। বরং শুনিয়ে শুনিয়ে বকতে থাকে—
“এত বড় ছেলে হয়েছিস, ভালো-মন্দ বোঝে না? ভালো থাকবি, সেটা তোর ভালো লাগে না! ঐ বাড়িতে যেতে তোর সমস্যা কোথায়?”
রুটির মোড়ক খুলে প্লেটে রাখে, মুহিতের সামনে এগিয়ে দিয়ে বলে,
“যা, হাত ধুয়ে আয়।”
মুহিত ছোট ছোট পায়ে বেসিনের দিকে এগিয়ে যায়। তার নিষ্পাপ চলন দেখে আরিফের মন হু হু করে ওঠে।
হাত ধুয়ে ফিরে এসে মুহিত বাবার সামনে চুপচাপ দাঁড়ায়। কর্কশ গলায় যেন স্নেহ গলে পড়ে—
“আয় কাছে আয়।”
বাবার স্নেহের স্পর্শে মুহিত ঝাঁপিয়ে পড়ে বাবার উপর। গলায় জড়িয়ে ধরে বলে,
“তোমাকে ছেড়ে আমি কোথাও যাব না বাবা। তোমাকে ছেড়ে আমি থাকতে পারব না।”
আরিফ ছেলেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বলে,
“আমিও কি তোকে ছেড়ে থাকতে পারি? কিন্তু আমি নিরুপায়। ঘরে বসে থাকলে না খেয়ে মরতে হবে। তোকে ওখানে পাঠাচ্ছি যাতে তুই ভালো থাকিস।”
মুহিত জিজ্ঞেস করে, “তুমি কী খাবে?”
আরিফ জবাব দেয়, “আমি একা মানুষ, একটা কিছু হয়ে যাবে।”
“আমি কি অনেক মানুষ যে আমার ব্যবস্থা করতে পারো না?”
আরিফ হেসে বলে, “ধুর বোকা! ব্যবস্থা করতে ঘরের বাইরে যেতে হয়, তোকে একা রেখে আমি বের হতে পারছি না। তাই তুই কাল নানার বাড়ি যা। আমি বের হতে পারলে দ্রুত একটা চাকরি খুঁজে নেব।”
এরপর মুহিতের রুটি ছিঁড়ে মুখে তুলে দেয় আরিফ। মনে মনে ভাবে—সকাল হলেই নিশ্চয় কিছু ভালো হবে। কিন্তু মুহিতের প্রার্থনা, যেন রাত আর ফুরায় না। কারণ ভোর মানেই বিদায়।
শীত এসে গেছে দরজায়। কার্তিক বিদায়ের পথে। দিনে রোদ, রাতে শীত—প্রকৃতির রহস্যময় আচরণ। ফজরের সময় থেকে আরিফ বারান্দায় বসে আছে, গায়ে পাতলা টি-শার্ট। শীত লাগছে, তবু নড়ছে না। কারণ, আজ ছেলেটা তাকে ছেড়ে যাবে।
মুহিত মাকে হারিয়ে বাবাকেই আঁকড়ে ধরেছে। রুনার মৃত্যুর সময়ও আরিফ ভেবেছিল, এত মায়াময় ছেলে কীভাবে মায়ের অনুপস্থিতি সহ্য করবে? অথচ দিব্যি দিন কাটাচ্ছে।
কিছু মানুষ ভেতরে গুমরে কাঁদে, মুখে প্রকাশ করে না। মুহিতও এমন।
আরিফ বিছানায় এসে পাশে বসে। মাথায় হাত রাখে। জিজ্ঞেস করে,
“ঘুম হয়েছে?”
“হুঁ।”
“আজকের সকালটা খুব সুন্দর, বারান্দায় যাবি?”
“না।”
“ঠিক আছে, আরেকটু ঘুমা।”
এরপর আবার বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায় আরিফ। কুয়াশা ফুঁড়ে রোদের আলো ছড়িয়ে পড়ছে। প্রকৃতি নবীন রোদের আনন্দে জেগে উঠেছে।
কচুবনের পাশে খয়েরি রঙের একটি প্রাইভেটকার দেখে আরিফের চেনা মনে হয়। আগেও রহমান সাহেব আর আফরোজা বানু এমন গাড়িতে এসেছিলেন।
ভেতরে গিয়ে দেখে মুহিত ওয়াশরুম থেকে বের হচ্ছে, চোখমুখ ভেজা।
“ঘুমাসনি?”
“আর ঘুম আসছিল না।”
“ব্রাশ করেছিস?”
“হ্যাঁ।”
হঠাৎ কলিং বেল বেজে ওঠে। সময়—ছয়টা দশ। দরজা খুলে দেখে আফরোজা বানু।
“মা! আপনি?”
“হ্যাঁ, চলে এলাম। তোমাকে বলতে পারিনি, যোগাযোগের উপায় নেই।”
তিনি সকাল হতেই চলে এসেছেন, যেন জ্যামে না পড়তে হয়। আফরোজা বানু তাড়া দেন,
“তোমার নানা ভাই অপেক্ষা করছেন। এখন রওনা দিলে সময় লাগবে না।”
আরিফ মুখে বলে নাস্তা হয়নি, কিন্তু তার আতিথেয়তার সামর্থ্য নেই।
তাই ব্যাগ হাতে নিয়ে মুহিতকে গুছিয়ে দেয়।
এমন সময় সায়মন এসে দাঁড়ায়।
“তুমি কোথায় যাচ্ছ? কেন যাচ্ছ? আর আমাদের স্কুলে আসবে না?”
মুহিত মাথা নিচু করে বাবার দিকে তাকায়, উত্তর দেয় না।
আরিফ কিছু বলার চেষ্টা করে, কিন্তু নিজেকে সংবরণ করে। বিদায়বেলায় আবেগ যেন দুর্বলতা না হয়।
এক হাতে ব্যাগ অন্য হাতে
মুহিতকে ধরে নিচে নেমে এলো। মুহিত সায়মনের দিকে তাকাল। মুখে কিছু না বলে চোখের ভাষায়
বিদায় জানাল। শাহানা বেগমও মুহিতকে বিদায় দিতে রাস্তা পর্যন্ত নেমে এসেছেন। ড্রাইভার
আগেই গাড়ি ঘুরিয়ে রাস্তামুখো করে রেখেছে। মুহিতদের দেখা মাত্র গাড়ি স্টার্ট করল।
বিদায়ের পর গাড়িতে উঠতে উঠতে আফরোজা বানু প্রশ্ন করেন,
“তুমি আমাদের এখানে কবে যাচ্ছ?”
আরিফ জবাব দিতে পারে না।
“তোমার সাথে যোগাযোগের উপায় নেই, তাড়াতাড়ি একটা মোবাইল নিয়ে নিও।”
আরিফ সম্মতিসূচকভাবে মাথা নাড়ে।
মুহিতের চোখে চোখ পড়ে—ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে, যেন শত কথা থেকে গেলো অমীমাংসিত।
গাড়ি চলে যায়। মুহিতের মুখ আর দেখা যায় না।
আরিফ দাঁড়িয়ে থাকে সায়মনের সঙ্গে। বুকের ভেতর একটা ভারি পাথরের মতো কিছু চাপা পড়ে আছে।
ঘরে ফিরতে ইচ্ছে করে না।
আরিফ বুঝে যায়—তার সুখেরা আর পাশে নেই। তারা বসতি বেঁধেছে সুদূরে, অজানায়।
চারপাশে কুয়াশার মতো এক গভীর নিরাশা।
তবুও সে জানে—একদিন সে সুখ খুঁজে পাবে।
সেই আশাতেই আজ সে পথে নামবে।
📢 মন্তব্য করুন
এই উপন্যাসের পরবর্তী পর্ব পেতে “সুখ-সুদূরে” ব্লগটি নিয়মিত পড়ুন।
আপনার মতামত আমাদের অনুপ্রেরণা জোগাবে।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন