সুখ সুদূরে – ( ১০ম) পর্ব | বাংলা উপন্যাস। আর্থিক সংগ্রামের বাস্তবধর্মী আবেগঘন পারিবারিক কাহিনি



🟨 SEO কিওয়ার্ড যুক্ত বিষয়বস্তু:
বাংলা  উপন্যাস।, পিতা-পুত্র সম্পর্ক, মায়ের অভাব, আর্থিক সংগ্রাম, বাস্তবধর্মী গল্প, আবেগঘন পারিবারিক কাহিনি


সুখ সুদূরে – ( ১০ম) পর্ব

 ইতোমধ্যে দুই মাসের বাড়িভাড়া বাকি পড়ে গেছে। তৃতীয় মাসটাও প্রায় শেষের পথে। দুদিন আগে বাড়িওয়ালা এসে তাগাদা দিয়ে গেছেন। কখন যে তিনি শেষবার এসেছিলেন, আরিফ বা মুহিত—দুজনের কেউই মনে করতে পারে না। এসেই এমনভাবে ফ্ল্যাটের চারপাশে চোখ বোলাতে লাগলেন যেন রঙচঙে দৃষ্টিতে ঘরটাই পরখ করছেন। দেয়ালের দিকে তাকিয়ে বললেন, “অনেকদিন রং করা হয়নি বুঝি?”

আরিফ শান্ত গলায় বলল, “খুব খারাপ হলে জানাতাম।”

বাড়িওয়ালা মুচকি হেসে বললেন, “সংকোচ করবেন না। আপনার বলায় আমারই তো লাভ। যত্ন ছাড়া গাভীও কী দুধ দেয়?”

আসলে রং করার কোনো প্রয়োজন নেই। তিন বছর আগে রং করা হয়েছে, এখনো তা চকচক করছে। মূলত ভাড়া চাইতেই এসেছেন তিনি। অথচ পানি পড়া কমে যাওয়ার সমস্যার কথা মাসের পর মাস জানালেও কিছু হয়নি।

আরিফের অনুরোধে তিনি বসতে বসতে বললেন, “আগে তো মাসে একবার দেখা হতো। এবার ভাবলাম অনেকদিন হয়ে গেছে, সমস্যা কিছু আছে কি না দেখে যাই। আপনি আবার কিছু মনে করেননি তো?”

“আপনার বাসা আপনি আসতেই পারেন,” আরিফ বলল।

“আমি আবার এমন ভাবি না। যতক্ষণ আপনি ভাড়া দিচ্ছেন, বাসা আপনার। কী ভুল বলেছি?”

আরিফ মৃদু হাসল। বাড়িওয়ালা একটু গম্ভীর হয়ে প্রশ্ন করলেন, “আপনার কী কোনো সমস্যা যাচ্ছে?”

একবার “জী না” বলার পর আবার চেপে চেপে বলল, “হুঁ।”

“উঁ... মনে হচ্ছে ভালো সমস্যায় পড়েছেন। না হলে এমন তো কখনও হয়নি। মুহিতকে দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। আপনি অফিসে গেলে ও কার কাছে থাকে?”

আরিফ মুহিতের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, “ওটাই তো সমস্যা হয়ে গেছে। ওকে সময় দিতে গিয়ে আমার চাকরিটা চলে গেছে।”

বাড়িওয়ালা যেন আকাশ থেকে পড়লেন, “বলছেন কি! এত ভালো চাকরি চলে গেল? চাকরি হারানো তো ইনজাস্টিস!”

“হুঁ, সে রকমই হয়েছে। চাকরি-টাকরি সবই কর্তার মর্জির উপর নির্ভর করে।”

“না না, এটা তো ঠিক বলেননি। আজকাল কর্মী ছাঁটাইয়ের নিয়ম আছে, নির্দিষ্ট কারণ ছাড়া সম্ভব না।”

“কারণ তো ছিল! সময়মতো অফিসে যাওয়া যেত না, তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরতে হতো।”

“তাই বলে চাকরি চলে যাবে! এটা তো খুবই অমানবিক! যাক, তিন মাস হতে চলল... কিছু করতে পারবেন?”

আরিফ কিছু না বললেও তাঁর মুখের অভিব্যক্তি বুঝিয়ে দিল বাস্তবতা। বাড়িওয়ালা নিজেই বললেন, “থাক, বুঝে গেছি। এখন না পারলেও একটু চেষ্টা করবেন। বুঝেন তো, যার যত আয়, তার তত খরচ। আল্লাহ নিশ্চয়ই একটা ব্যবস্থা করে দেবেন। তিনি কাউকে আটকান না, শুধু পরীক্ষা নেন।”

আসলে আরিফের এখন কোনো ব্যবস্থা নেই। পাওনাদার বাড়ছে—মুদি দোকানদার, স্কুলের বেতন, বাসা ভাড়া। এই চাপে পড়ে সে সিদ্ধান্ত নেয়, সোফা বিক্রি করে দেবে। একটু পরেই ক্রেতা আসবে, তাই পরিষ্কার করছে।

মুহিত কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, “সোফা বিক্রি করে দেবে?”

আরিফ বলল, “আমাদের দুজনের জন্য এত কিছু দরকার নেই। তাছাড়া কেউ তো আসেও না। বরং বাড়তি জিনিস মানে বাড়তি ঝামেলা। মুছরে ভালো করে। যত উটকো ঝামেলা!”

মুহিত শান্ত চোখে তাকায়। মনে হয় বলতে ইচ্ছে করছে, "মা তো খুব ভালোবাসতেন এই সোফাগুলো," কিন্তু চুপ থাকে।

আরিফ বলল, “কষ্ট পেয়ে লাভ নেই। আজকে যা আমার, কাল তা অন্যের হয়ে যায়। তাছাড়া এই বাসাটা আমাদের ছেড়ে দিতে হবে। এত বড় বাসা আমাদের দরকার নেই।”

এই বাসার সঙ্গে মুহিতের আত্মিক সম্পর্ক। জন্মের পর এই বাসায়ই প্রথম এসেছিল। এখানেই তার বেড়ে ওঠা। বাসা ছাড়ার কথা শুনে বুক ধক করে উঠলেও মুখে কিছু বলল না।

এমন সময় ক্রেতা চলে আসে—নতুন দম্পতি, সদ্য বিয়ে হয়েছে মনে হয়। মুখে হাসি, চোখে ভালবাসা। ঘরের জন্য জিনিসপত্র কিনছে।

আরিফ বলল, “আপনাদের জন্যই সোফাটা এগিয়ে রেখেছি। দেখে নিন, পছন্দ হয় কি না।”

মেয়েটির নাম শান্তা। স্বামী বললেন, “দেখে নাও শান্তা, পছন্দ হয় কি না।” শান্তা সোফার চারপাশে ঘুরে দেখে বলল, “ডিজাইনটা বেশ ভালো। ক’বছর ব্যবহার করেছেন?”

“বেশি হলে দু’বছর।”

“তাই তো এত লেটেস্ট! বিক্রি করে দিচ্ছেন কেন?”

“বাসা ছেড়ে দিচ্ছি, জিনিসপত্র কমাতে হচ্ছে।”

মুহিতের দিকে তাকিয়ে শান্তা বলল, “বেশ মিষ্টি তো! আপনার ছেলে?”

“হ্যাঁ।”

“ওর মা কোথায়?”

“মা নেই।”

নেই কথাটার অর্থ শান্তা যেন ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। স্বামীর দিকে তাকায়। তার কল্পনায় বিচ্ছেদ, পরকীয়া, না জানি কী! তবে আর প্রশ্ন করে না। মুহিতের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। হাস্যজ্জ্বল মুখ হঠাৎই নরম হয়ে ওঠে।

তাতে আরিফের লাভই হয়। ভাবনার চেয়ে বেশি দামেই সোফা বিক্রি হয়। কিন্তু তাতেও ভাড়ার পর আর হাতে তেমন কিছু থাকে না। হিসেবের গড়মিলে মন ভারী হয়ে ওঠে। ছেলেকে ভালো কিছু খাওয়ানোর কথা ছিল, তা আর হলো না।

রাতে মুহিত বাবার বুকে শুয়ে আছে। আরিফ বলল, “তোর নানুভাই ফোন করছেন। তোকে তাদের কাছে রাখতে চান। যাবি নানুর বাসায়? ভাল ভাল খাবার পাবি।”

“আমার ভাল খাবার ভাল লাগে না।”

“তুইই তো সেদিন বললি, এসব ভাল লাগে না?”

“সেদিন ভাল লাগছিল না।”

“মানে, তুই যেতে চাস না?” দীর্ঘশ্বাস ফেলে আরিফ বলল, “ঠিক আছে, ভাত খাবি চল। আলু ভাজি আর সকালের ডাল।”

“হুঁ, চলবে।”

মুহিত বলল, “মা আমাদের ছেড়ে এত তাড়াতাড়ি চলে গেল কেন? কত মানুষের মা আছে। আমার মায়ের মরার এত তাড়া ছিল কেন?”

আরিফের চোখ ঝাঁপসা হয়ে ওঠে। ধরা গলায় বলে, “পৃথিবীর সব কিছু নিয়ম মেনে হয় না।”

মুহিত মায়ের ছবির সামনে দাঁড়ায়। মুখ বিকৃত হলেও কান্না চেপে রাখে। সে ধীরে ধীরে চাপা স্বভাবের হয়ে উঠছে, রুনা থাকতে এমন ছিল না।

“মায়ের কথা খুব মনে পড়ছে?” আরিফ প্রশ্ন করে।

মুহিত কিছু না বলে চোখ নামিয়ে নেয়।

অভাব, অনটন আর দুর্দিন মানুষকে ভেঙে দেয়। শক্ত মানুষও দুর্বল হয়ে পড়ে। চোখ ভিজে আসে শিশুর মতো। আরিফও সেই অবস্থায়। কিন্তু ছেলের সামনে সবসময় একটুকরো হাসির মুখ নিয়ে থাকে।

বুক ফেটে কান্না এলেও কাঁদতে পারে না। দুঃখ ঢেকে সুখী মানুষের অভিনয় করে চলে সে।

“বোকা ছেলে, মা কি সবার থাকে? আমার মা-বাবার মুখই মনে নেই। আমি তো কাঁদি না! আমি তো তোকে আদর করি, না?”

মাথায় হাত দিতে গিয়ে বুঝতে পারে, মুহিতের চুল আঠালো। “কতদিন শ্যাম্পু করিস না? কাল শ্যাম্পু করবি।”

“বাসায় শ্যাম্পু নেই।”

“ওহ! কালকে নিয়ে আসব। এবার চল খেতে বসি। অনেক রাত হয়েছে।”


📢 মন্তব্য করুন

এই উপন্যাসের পরবর্তী পর্ব পেতে “সুখ-সুদূরে” ব্লগটি নিয়মিত পড়ুন।

আপনার মতামত আমাদের অনুপ্রেরণা জোগাবে।




মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

সুখ সুদূরে (প্রথম পর্ব) | বাংলা উপন্যাস | আশিষ কৃষ্ণমুখ

সুখ সুদূরে ( ২য় পর্ব) বাংলা উপন্যাস। আশিষ কৃষ্ণমুখ

সুখ সুদূরে (৪র্থ পর্ব) বাংলা উপন্যাস। আশিষ কৃষ্ণমুখ