সুখ সুদূরে – ( ৯ম) পর্ব | বাংলা উপন্যাস। সম্পর্ক, বেকারত্ব ও সমাজ বাস্তবতার এক নিটোল ছবি
Meta Description (বাংলা ও ইংরেজিতে):
বাংলা গল্প “সুখ সুদূরে”–এর ৯ম পর্বে উঠে এসেছে বাবার চোখে দেখা শহর, এক শিশুর মায়া, এবং সম্পর্কের জটিলতা। শাওন-শর্মির সংলাপে প্রেম, বিয়ে ও সামাজিক মোহের দ্বন্দ্ব স্পষ্ট।
Explore part 9 of the Bengali story “Sukh Sudure,” where family, survival, and emotional ironies blend into a moving tale.
🔍 SEO Keywords:
বাংলা গল্প, সুখ সুদূরে, বেকারত্ব, ঢাকার জীবন, বাংলা ফিকশন, বাংলা সাহিত্য, সামাজিক বাস্তবতা, সম্পর্কের টানাপোড়েন, গল্প সিরিজ, bangla golpo
৯ম পর্ব
বিকেলবেলা বাবা-ছেলে ঘুরতে বের হলো। কিছুটা পথ রিক্সায় চড়ে তারপর কিছুটা পথ ফুটপাত ধরে পায়ে হেটে হাইকোর্টের সামনে হয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঢুকল। সে সময় মুহিতের হাত শক্ত করে ধরেছিল আরিফ। সকালবেলাই পরিকল্পনা করা হয়েছিল ঘুরতে বের হবে। কিন্তু কোথায় যাবে ঠিক করা ছিল না। রিক্সায় ওঠে মনে হলো স্বল্প সময়ের জন্য এ দিকটায় যাওয়াই ভালো। রিক্সায় আসতে আসতে ঢাকার শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো সম্পর্কে মুহিতকে জ্ঞান দিতে দিতে এসেছে। ‘শিখা চিরন্তনের’ পাশ দিয়ে যেতে আরিফ থেমে বলল, এখানে কী হয়েছিল জানিস?
মুহিত মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, জানি।
জানিস! কি জানিস?
এখানে বঙ্গবন্ধু ৭ই মার্চে ভাষণ দিয়েছিলেন।
আরিফ পুলকিত হয়ে জিজ্ঞেস করল, কী করে জানলি?
তুমি আরো একবার বলেছিলে। তখন মা-ও ছিল।
আরিফ ছোট্ট করে নিঃশ্বাস ফেলে বলল, ওহ। ওরা একটু এগিয়ে
স্বাধীনতা স্তম্ভের সামনের জলাশয়ের গা ঘেঁষে বসল। মুহিতের মুখে মা শব্দটা শোনার পর
থেকে আরিফকে উদাস দেখায়। এর আগে কোনো এক বিকেলে রুনাসহ এখানে ঘুরতে এসেছিল। আজ আবার
এসেছে কিন্তু রুনা নেই। সময় কত দ্রæত স্মৃতি হয়ে যায়, সবকিছু বদলে দেয়। সেই ভাবনায়
আরিফের দৃষ্টি শূণ্যে আটকে পড়ে। পাশে থাকা মুহিতের কথা তার মনে নেই। মুহিত জলের মধ্যে
আকাশের প্রতিবিম্ব দেখে। নীল আকাশে সাদা মেঘ ও
কালো মেঘ আর তাদের দৌড়ঝাঁপ দেখে।
সেসময় একজন ভিক্ষুক মহিলা এসে অসহায় ভঙ্গিতে তাদের সামনে
দাঁড়াল। তার উপস্থিতিতে দুজনের মনোযোগ এক হল। মহিলাটির কাঁধে একটি ঘুমন্ত শিশু। হাত
ধরে রেখেছে বছর পাঁচেকের আরো একটি শিশুর। শিশুটির গায়ে একটি ময়লা জামা। উন্মুক্ত বুক।
সে হাত থেকে ছুটে মাটিতে পড়ে থাকা পরিত্যাক্ত কোকাকোলার ক্যান কুড়িয়ে আপ্রাণ চেস্টা
চালাচ্ছে এক বিন্দু পানীয়র আশায়। মনে হচ্ছে কিছু পেয়েছে। সে জিব দিয়ে ঠোঁট লেহন করল।
দেখে মায়া হওয়ার কথা কিন্তু আরিফের মায়া হলো না।
ঢাকা শহরের ভিক্ষুক চক্রের কথা সবারই কম বেশি জানা। ভিক্ষাবৃত্তিতে
নানা অপকৌশল প্রয়োগ হচ্ছে আজকাল। অন্যের সন্তান ভাড়া নেওয়া, তাদের ওষুধ খাইয়ে নিস্তেজ
করে রাখা, ইচ্ছে করে পঙ্গু বানিয়ে রাখা। তারপর তাদের দেখিয়ে ভিক্ষা চাওয়া। এইসব কারণে
মানুষের ভিক্ষুকদের প্রতি আর মায়া হয় না। ভিক্ষুক মহিলা অসহায়ভাবে বলতে লাগল, স্যার
এই বাচ্চাডি এতিম, বাপ নাই। দুইদিন ধইরা খাওন নাই, কাঁধের বাচ্চাটিকে দেখিয়ে বলল, এই
বাচ্চাডার শইল ভালা না। কিছু যদি সাহাইয্য করতেন।
মুহিত বাবার মুখের দিকে তাকাল। তার এই তাকানোর অর্থ কিছু
টাকা দিয়ে দাও বাবা। আরিফের ভিক্ষুক মহিলার কথা বিশ্বাস হয় না। সে হয়ত একই কথা প্রতিদিন
হাজার জনকে বলে আসছে বছরের পর বছর। এই বাচ্চাগুলো তার কিনা সন্দেহ হয় আরিফের। মুহিত
পৃথিবীর মানুষের প্রতারণা সম্পর্কে এত তাড়াতাড়ি জানুক সে চায় না। তাই কিছু দিয়ে তাড়াতাড়ি
বিদেয় করতে চায়। আরিফ মানিব্যাগ থেকে টাকা বের করতে গেলে দুটি দশ টাকার নোট বেরিয়ে
আসে। সে একটি দিয়ে আরেকটি রেখে দেয়। ভিক্ষুক মহিলা কিছু দূর গিয়ে আবার ফিরে এসে বলল,
স্যার এইডির পেডে খাওন নাই। কিছু কিন্না দেন না। আবারও সেই অসহায় ভঙ্গি।
আরিফ কঠিন চোখে মহিলার দিকে তাকিয়ে বাকি দশ টাকা দিয়ে দিল।
বাকি টাকা পেয়ে মহিলা দ্রæত চলে গেল। যাওয়ার সময় তার চলনে অসহায়ত্বের চিহ্নটুকু ছিল
না।
তখন সন্ধ্যা হয়-হয়।
ক্রমশ অন্ধকার নামার কথা হলেও উল্টো হলুদ আলোয় মুড়ে গেল
পৃথিবী। আশ্চর্য রকমের হলুদ। আরিফ প্রকৃতির এইরূপ আরো দেখেছে। প্রকৃতির বিচিত্র রূপ
নিয়ে সাধারণ মানুষের তেমন মাথা ব্যথা থাকে না। যত ব্যথা শিল্পী-সাহিত্যিকদের। আরিফ
শিল্পী-সাহিত্যিক কিছুই না। তার মাথা ব্যথাও নেই। আরিফের কাছে স্বাভাবিক মনে হলেও মুহিতের
মনে নানা প্রশ্ন। কিন্তু কেন এই হলুদ আলো মুহিতের প্রশ্নের কোন ব্যাখ্যা আরিফ দিতে
পারে না। শুধু বলল, গ্রীষ্ম-বর্ষাকালে এমন হয় মাঝেমধ্যে। আরিফ কোথায় যেন এই হলুদ আলোর
ব্যাখ্যা পড়েছিল মনে করতে চেস্টা করছে। কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারল না। মনে করতে
করতে হলুদ রঙ-ও মিলিয়ে অন্ধকার নামতে শুরু করল।
মুহিতের দিকে তাকিয়ে বলল, চল যাই।
মুহিত মুখে কোন শব্দ না করে মাথা হেলালো। আরিফ আগের মতই
মুহিতের হাত শক্ত করে ধরে হাঁটছে। হাঁটতে হাঁটতে তার মনে পড়ল সে এখন বেকার। চাকরি নেই।
হাতে যে ক’টা
টাকা অবশিষ্ট রয়েছে তাতে এ মাসটা চলে যাবে। আগামী মাস কী করে চলবে? ধার শোধ কী করে
হবে? রুনার চিকিৎসায় আরিফ ঋণগ্রস্থ হয়েছে। ঋণ শোধ করতে শুরু করেছিল। চাকরি চলে যাওয়ায়
বিপদ হয়ে গেল এই ভাবনায় বিভোর হয়ে সে পথ হাঁটছে। আরিফের এখন ভিক্ষুক ছেলেটির কথা মনে
পড়ে মায়া লাগছে। পরিত্যাক্ত ক্যানটাকে সে কিভাবে নিংড়ে খেল! যদি একটা ভর্তি ক্যান পেত
কতই না আনন্দ পেত। হতেও তো পারে চরম অভাবের তাড়নায় তার মা মানুষের কাছে হাত পাতছে।
আগামী মাসে আমি যদি বলি আমার পকেটে টাকা নেই, মানুষ কী বিশ্বাস করবে? আমার তো সত্যি
পকেটে টাকা থাকবে না। মানুষ না জেনেই কত কথা বলে, কত কী ভাবে! আরিফের অনুশোচনা হয়।
ধুর! না জেনে না শুনে কাউকে অবিশ্বাস করা ঠিক না।
মুহিতের হাতের টানে আরিফ দিশা ফিরে এলে মুহিতের দিকে তাকিয়ে
বলল, কিরে বাবা কী হয়েছে?
বাবা আমি আর হাঁটতে পারছি না।
আরিফ চারদিকে তাকিয়ে দেখল তারা অনেকটা পথ হেঁটে চলে এসেছে।
আরিফ অনুতপ্ত হয়ে বলল, সরি বাবা, তোকে অনেক কষ্ট দিয়ে ফেলেছি, আমার যে কী হলো! আমি
এখনি রিক্সা নিচ্ছি।
শর্মি কফি খাচ্ছে।
শাওন বসে বসে দেখছে। তার সামনেও ধোঁয়া ওঠা কফির মগ।
শর্মি বলল, ঢং না করে খেতে পারো। এ সুযোগ হয়তো আর আসবে
না। হতে পারে আমার সাথে এটাই শেষ কফি খাওয়া।
শাওন বলল, শেষ বলে কিছু নেই। যদি না মৃত্যু হয়। মৃত্যুতেই
এই থিওরি সার্থক। মৃত্যুতেই কেবল সব শেষ। আছে নাকি এমন সম্ভাবনা?
শর্মি কঠিন চোখে শাওনের দিকে তাকাল। চোখ নামিয়ে বলল, বাবা
আমার বিয়ে দেখছে।
এখনো ঠিক করা হয়নি আর কফি খাওয়ার ইতি টেনে দিচ্ছ?
শীঘ্রই ঠিক হয়ে যাবে।
সেই তো ভালো হবে। বিয়ের পর তুমি আমি আর তোমার স্বামী তিনজনে
একসাথে কফি খাব। মজা হবে না? বিল নিয়ে ঝামেলা করা চলবে না। বিল আমি দেব। কিন্তু তোমার
তো আমাকে বিয়ে করার কথা। তিনজন হবে কী করে!
তুমি বিল দিবে কোত্থেকে? তোমার তো পকেটই নেই। আর তুমি বৈরাগী
মানুষ। বিয়ে করবে?
সেই তো! মায়ার বন্ধনে জড়ানো মহাপুরুষের কর্ম নয়। এই বন্ধনে
জড়ালে নিজেকে জানার খেল খতম। তুমি বিয়ে করবে কেন?
আমি বৈরাগী না। বিয়ে করতে সমস্যা নেই।
জগতে বিয়েটাই মুখ্য বিষয়?
শর্মি বলল, আমার কাছে মুখ্য বিষয়। বিয়ের পর বাচ্চা হবে,
তাদের বড় করব, বড় হয়ে ওরা
প্রেম-টেম করে ঝামেলা বাঁধাবে। পরিবেশ থমথমে হবে আবার সব
ঠিকঠাক হয়ে যাবে। এক জীবনে অনেক ঝামেলা আবার সুখ। ওফ! ভাবতেই এক্সাইটেড লাগে। আর সব
থেকেও যারা ছন্নছাড়া তাদেরকে মানুষ পাগল বলে মহাপুরুষ না। সেরকম মানুষ আমার মোটেও পছন্দ
না।
শাওন বলল, বিয়ে করবে ঠিক আছে। কিন্তু এত তাড়া কীসের?
বিয়ে তাড়াতাড়ি করাই ভালো। দেরী করে বিয়ে করার অনেক ঝামেলা।
তাড়াতাড়ি বিয়ে করে জামাই নিয়ে তিন বছর ফুর্তি করব।
ফুর্তি!
হ্যাঁ, ফুর্তি মানে ফুর্তি। রোমান্স করব, ঘুরে বেড়াব। তারপর
তিন বছর পর বাচ্চা নিব। সবশেষে আগাগোড়া গৃহিণী।
তুমি তো দেখি সব পরিকল্পনা করেই ফেলেছ।
তাইতো। পরিকল্পনা ছাড়া চলে বোকারা।
জীবন মোহে অন্ধ তুমি। লম্বা করে নিঃশ্বাস ফেলল শাওন।
সকল বুদ্ধিমানরাই মোহাবিষ্ট। তাতে কোনো দোষ নেই। বরং তুমি
যে ছংভং করছ এর জন্য তোমাকে একদিন পস্তাতে হবে। সময় খুইয়ে সময়ের জন্য কাঁদতে হবে। বাদ
দাও, তোমাকে কেন বলেছি এসব কথা? এবার বল আমার বিয়েতে কী গিফট দিবে?
শাওন শর্মির মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, আমি তো তোমার মধ্যে
বিয়ের লক্ষণই দেখছি না। গিফট তো পরের কথা।
শর্মি বলল, বিয়ে কোন রোগ না। লক্ষণ দেখা দিবে। লক্ষণ ছাড়াই
বিয়ে হবে।
শাওন বলল, বিয়ে কোন রোগ নয় একথা ঠিক না। বরং কঠিন রোগ।
একবার এই রোগ হলে বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত সারে না।
তার মানে আমার বিয়ে রোগ হয়েছে?
আমি সে কথা বললাম কোথায় বলে গøাসের ভিতর দিয়ে শাওন আকাশের
দিকে তাকাল। শহরের কৃত্রিম বাতির সমুদ্র থেকে চাঁদকে আলাদা করা দুরূহ কাজ। তারপর বলল,
চাঁদ উঠেছে। তাইতো দেখা যাচ্ছে।
শর্মি ব্যাগ হাতে নিয়ে বলল, কফির দাম দিয়ে এসো বলে দ্রæত
বেরিয়ে গেল সে।
শাওন পাঞ্জাবির পকেটে হাত ঢুকানোর বৃথা চেষ্টা করে আবার
আগের স্থানে বসল। ওয়েটার বিল নিয়ে পাশে এসে দাঁড়াল। বিল সর্বমোটে তিনশ পঁচাত্তুর টাকা।
আইটেম দুই। দুই কাপ কফি আর ফ্রেঞ্চ ফ্রাই। আপনি যান বলে শাওন বিলের দিকে চোখ রাখল।
বিল দিতে হবে কিন্তু পকেটে টাকা নেই চিন্তা হওয়ার কথা। শাওনের চিন্তা হচ্ছে না। তার
চোখ এখন ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের মূল্যের উপর। পাশে দাম লিখা একশ পঞ্চান্ন টাকা। ওটাই এখন
তার ভাবনার বিষয়।
যে পরিমাণ ফ্রাই দেওয়া হয়েছে তাতে কী এমন খরচ! বড়জোর ছ’টাকা
পঁচিশ পয়সার আলু, নুনপানি. হলুদ আর তেল। মসলা কি কিছু ছিল! মসলার কোন টেস্ট খুঁজে পাচ্ছে না। তারই এত দাম?
বিদেশি শব্দ তাই! মেটেরিয়াল তো সব দেশি। শাওন চারদিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল, এইসব
ঠান্ডা হাওয়ার মূল্য!
ওয়েটার এসে বলল, আপনার বিল পেমেন্ট হয়ে গেছে। আপনি এখন
যেতে পারেন।
আমি কী এতক্ষণ বন্দী ছিলাম?
ওয়েটার লজ্জিত ভঙ্গিতে বলল, জ্বী না স্যার। আপনিই তো বসে
রইলেন।
জ্বী আবার না, নিজে নিজেই বলল। যেতে চাইলে যেতে দিতেন?
ওয়েটার শাওনের কথা বুঝতে পারল না। কিন্তু হাসির রেখা মুখে
স্পষ্ট ভেসে রইল।
বিল পরিশোধ করল কে?
আপনার সাথে যে ম্যাডাম ছিলেন, তিনি।
সে এখন কোথায়?
বাইরে ছিলেন। ওয়েটার চলে যাচ্ছিল। শাওন থামিয়ে জিজ্ঞেস
করল, আপনার নাম কী?
মিজানুর রহমান।
আচ্ছা মিজানুর রহমান ফ্রেঞ্চ ফ্রাইতে কী কী মসলা দেওয়া
হয়?
আমি জানি না স্যার।
টপ সিক্রেট! কে জানে? বাবুর্চি?
জ্বী স্যার। দেখা করবেন?
না থাক। আপনি এখন যেতে পারেন। শাওন কাঁচের দরজা ধাক্কা
দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো।
শর্মি হাতের ঘড়িতে তাকিয়ে বিরক্তমুখে শাওনের দিকে তাকাল।
আসতে দিল?
তুমি যেখানে আছো আমাকে আটকিয়ে রাখে কে?
শাওনের কথায় শর্মি ভেতরে ভেতরে খুশি হলেও মুখে কঠিন ভাব
করে বলল, আচ্ছা তোমার লজ্জা করে না মেয়েদের টাকায় খেতে?
মেয়েদের টাকা নেংটা থাকে নাকি?
শর্মি ভেবাচেকা খেয়ে গেল শাওনের অপ্রত্যাশিত প্রশ্নে। লজ্জিত
বোধ করল। আশপাশ দিয়ে মানুষ অবিরাম চলাফেরা করছে। শাওন আবার কখন এরচেয়ে জঘন্য কথা বলে
বসে। সে দ্রæত এই জায়গা ত্যাগ করতে চাইছে। চল ।
কোথায়?
জাহান্নামে। রিক্সায় ওঠো।
সেই তোমাকেই ভাড়া মিটাতে হবে। তোমার টাকার কাপড় চোপড় ঠিক
আছে তো? নাহলে তো আমার জন্যই লজ্জার।
শর্মি রাগন্বিত ভঙ্গিতে তাকাল। শাওন রিক্সায় ওঠে বসল। রিক্সা
চলছে গন্তব্যহীন। এই রাস্তাটা বেশ ফাঁকা, অন্য রাস্তার মতো যানবাহন নেই। রিক্সাওয়ালা
কয়েকবার জিজ্ঞেস করল, আফা কই যাইবেন?
শর্মি বলল, আপনি চালাতে থাকেন।
এইডা কোনো কথা? আমি অহন কোন দিকে যামু?
নাকের ডগা বরাবর যান। শর্মি শাওনের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
তুমি যে খালি পকেটে রাস্তায় বের হয়ে বিভ্রান্ত হও তোমার খারাপ লাগে না?
উঁহু, পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ খালি পকেটে ঘুরছে। খারাপ
লাগলে চলতে পারত?
যাদের নেই তারা ঘুরছে ঘুরুক। তোমার কীসের সমস্যা?
যাদের নেই তাদের সমস্যাও অনুভব করতে হবে।
আজাইরা কথা। তাতে কী হবে? শর্মি শাওনের দিকে তাকিয়ে বলল,
তোমার ইচ্ছেটা কী বলো তো?
আমার ইচ্ছে তোমার পাশে বসে থাকি।
বসে তো আছই। ঢং। তোমার ভবিষ্যৎ প্ল্যান জানতে চাইছি, বুঝেছ?
প্ল্যানটা কী?
শাওন মহাপুরুষের ভঙ্গিতে বলল, প্ল্যান মানে তো পরিকল্পনা।
আর পরিকল্পনা থাকে মোহাবিষ্টদের। আমি যে মোহ মুক্ত বলে চোখ তুলে শর্মির দিকে তাকাল।
তোমার কোনো মোহ নেই!
শাওন মাথা নাড়ল, নাহ।
এই যে পাশে বসতে চাইলে?
সে তো ক্ষণিকের জন্য।
শর্মি ভারী নিশ্বাস ছাড়ল। রিক্সাওয়ালাকে রিক্সা ঘুরাতে
বলল। রিক্সা ঘুরে আসার সময়টুকুতে আর কথা হলো না। শর্মি রিক্সা থেকে নামল। রিক্সাওয়ালা
ভাই আপনার কত হয়েছে?
একশ টাকা দেন।
আপনাকে দুইশ টাকা দিচ্ছি। বাকি একশ টাকার মধ্যে এই লোক
যেখানে যেতে চায় নিয়ে যাবেন।
তুমি চলে যাচ্ছ, আমার ইচ্ছে পূরণ তো হলো না।
ক্ষনিকের চেয়ে বেশি হয়েছে। শর্মি দ্রæত গেইটের ভিতর ঢুকে
গেল। শাওন পেছন থেকে তাকিয়ে রইল। রিক্সাওয়ালা বলল, কই যামু ভাই?
বনানীর দিকে যাও। কিছুক্ষণ পূর্বের পূর্ণ রিক্সাটি এখন
ফাঁকা প্রায়। সেই রকম একটা ফাঁকা ফাঁকা অনুভুতি শাওনের বুকেও লাগছে। অদ্ভুত একটা বিষন্নতা।
কিন্তু কেন এই অকারন বিষন্নতা? নিজেকে নিজে প্রশ্ন করে। শর্মি গেইটে ঢুকার সময় একটু
থেমে বলে গেল, তুমি একদিন বলেছিলে হলুদ হচ্ছে অনুভবের রং অর্থাৎ বোধের রং। আমি খেয়াল
করে দেখেছি যেদিন থেকে তুমি হলুদ নিয়ে পড়েছ সেদিন থেকে তোমার বোধশক্তি কমতে শুরু করেছে।
তাহলে কী সত্যি আমার মধ্যে পাগলামি দেখা দিচ্ছে?

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন