সুখ সুদূরে – (পর্ব ৮) বাংলা উপন্যাস। চাকরি হারানো এক বাবার লড়াই ও ছেলের ভালোবাসা |
✅ SEO Meta Description:
চাকরি হারানো, সন্তানের জ্বর, অফিস রাজনীতি এবং একজন বাবার আত্মত্যাগ—সব মিলিয়ে হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া এক গল্প। পড়ুন "সুখ সুদূরে" ধারাবাহিকের ৮ম পর্ব।
✅ SEO Keywords:
সুখ সুদূরে ৮ম পর্ব, বাংলা গল্প, আরিফ ও মুহিত, বাবা ছেলের সম্পর্ক, চাকরি হারানোর গল্প, অফিস রাজনীতি, বাংলা ধারাবাহিক উপন্যাস, আবেগময় গল্প
✒️ সুখ সুদূরে – পর্ব ৮
জানি না।
ঠিকাছে, তুমি যাও। আমি আসছি।
শেষ চুমুক চা ছিল ঠান্ডা
শরবতের মত। অনেকটা সিরার টেস্ট। মুখ মিষ্টি লাগছে। চা খেয়ে সঙ্গে
সঙ্গে পানি খেতে নেই। আরিফের পানি খেতে ইচ্ছে করছে। বস শ্রেণির লোকেরা
এমনি এমনি অধঃস্তনদের রুমে ডাকে না। তারা বেশির ভাগ সময় দুই কারণে রুমে ডেকে নেয়—এক, কোনো নতুন কাজের কথা বলতে, দুই, বকাঝকা করতে।
হয়তো এখন যাওয়ার পর মুখ কালো
করে বলবে,
— “আপনি
সময়
মত অফিসে আসছেন না, এভাবে অফিস চলবে? আপনার চাকরি আছে কী করে?”
এইসব শুনে মুখ ভার করে বেরিয়ে আসতে হবে।
আরিফ গ্লাসের দরজা ঠেলে ভিতরে প্রবেশ করে হিমেল হাওয়ার ধাক্কা অনুভব করে। সম্পূর্ণ অফিসটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। তবে এই রুমটি একটু
বেশি নিয়ন্ত্রিত। কারণ এই অফিসের বড়
কর্তা লোকটি শীত-গ্রীষ্ম বারো মাস কোট পরে অফিস করেন।
আরিফকে দেখে বললেন,
— “বসুন।”
আরিফের জিজ্ঞাসু মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— “কেন
ডেকেছি,
এই তো প্রশ্ন?”
— “জ্বী
স্যার।”
কী যেন খুঁজতে খুঁজতে বস বললেন,
— “আপনার
রেপুটেশন
দিন
দিন
খারাপের
দিকে
যাচ্ছে।”
অনুসন্ধিত বস্তুটি তিনি পেয়েছেন—অ্যাটেনডেন্ট শীট। শীটটি আরিফকে এগিয়ে দিয়ে বললেন,
— “দেখুন
আপনার
অবস্থা।
গত একমাসের বায়োমেট্রিক হাজিরা তথ্য।”
আরিফ শীট হাতে নিয়ে বসে আছে। শীটে চোখ রাখলেও কিছুই বুঝতে পারছে না। কিছু এলোমেলো বর্ণ ছাড়া।
বস আবার বললেন,
— “দেখে
বলুন
আপনার
চাকরি
থাকার
কথা?
কাল
থেকে
কী করা উচিত সিদ্ধান্ত আপনিই নিন।”
আরিফ ‘সরি’ বলে উঠতে গেলে তিনি আবার বললেন,
— “আমার
তো কথা শেষ হয়নি।”
আরিফ আবার পূর্বের স্থানে বসে পড়ল।
— “আমাদের
চট্টগ্রামের
অফিস
আগামী
সপ্তাহে
উদ্বোধন
হতে
যাচ্ছে।
কিছু
ফিনিশিং
কাজ
বাকি
রয়েছে।
আপনি
কালই
চট্টগ্রাম
যাবেন।
বাকি
কাজ
আর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সকল দায়িত্ব আপনার।”
আরিফ হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে। বলা নেই কওয়া নেই—আমাকে কালই চট্টগ্রাম যেতে হবে!
আরিফের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— “আপত্তি
আছে?
পারিবারিক
সমস্যা?
কিচ্ছু
করার
নেই।
আপনি
যাচ্ছেন—ফাইনাল, এটাই সিদ্ধান্ত।”
— “স্যার,
আমার
কিছু
কথা
ছিল।”
— “চট্টগ্রাম
যাচ্ছেন—এই কথার বাইরে কথা থাকলে বলুন।”
— “জ্বী
নেই।
তাহলে
আমার
কথা
শেষ।
আপনি
যেতে
পারেন।
আপনার
টেবিলে
কী কী কাজ আছে শেষ করে যাবেন।”
আরিফ শান্ত পায়ে হেঁটে বেরিয়ে যাচ্ছিল।
বস আবার পেছন থেকে ডেকে বললেন,
— “এখন
আপনার
রেপুটেশন
খারাপ
হলেও
এক সময় খুবই ভালো ছিল। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি চট্টগ্রামের অফিসে আপনাকে ম্যানেজারের দায়িত্ব দেব।”
আরিফের কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। এসি রুমে তার গরম লাগছে। হঠাৎ করে মাথায় পাহাড় চেপে বসেছে এমন মনে হচ্ছে।
— “কি
ব্যাপার!
একটা
থ্যাংকসও
দিবে
না মনে হচ্ছে।”
— “জ্বী,
থ্যাঙ্ক
ইউ স্যার।”
আরিফ বেরিয়ে গেল।
বস অবাক হয়ে তাকিয়ে নিজ মনে বললেন,
— “শাস্তির
বদলে
প্রমোশন
দিলাম,
তারপরও
খুশি
না!
মানুষ
খুশিটা
কিসে?”
আরিফ নিজের টেবিলে ফিরে এসেছে। পাশের টেবিল থেকে রকিব সাহেব বললেন,
— “আরিফ
সাহেব,
সুখবর
শুনলাম।”
— “সুখবর!
হ্যাঁ,
সুখবর।”
রকিব সাহেব নিজের চেয়ার ছেড়ে আরিফের সামনে রাখা চেয়ারে বসলেন। তারপর বললেন,
— “কি
ব্যাপার
আপনি
খুশি
হননি?”
— “খুশি
হওয়ারই
কথা।
কিন্তু
খুশি
হতে
পারছি
না।”
— “বলেন
কী!
কেন?”
— “হুট
করেই
চট্টগ্রাম
কী করে যাই বলেন তো? তাও আগামীকাল। দুইটা দিন আগে বললে কী হতো?”
রকিব সাহেব বললেন,
আরিফ টু-শব্দটি করল
না। তার মন পড়ে আছে
বাসায়। যতই চেষ্টা করছে হাতের কাজ ফুরাচ্ছে না। ভেবেছিল তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরে যাবে। ছেলেটা একা একা কী করছে কে
জানে? আজকেই সব করতে হবে।
অর্ডার দিয়েই শেষ।
আরিফের কাজ শেষ হলো রাত আটটায়। ততক্ষণে অফিসের সবাই চলে গেছে। রাশেদ বিরক্ত মুখ নিয়ে বসে আছে। আরিফ বের না হওয়া পর্যন্ত
তাকে বসে থাকতে হবে।
আরিফ দ্রুত ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে রিক্সা ডেকে উঠে পড়ল।
মুহিত মনে হয় ভয় পাচ্ছে।
আরিফের ইচ্ছে করছে রিক্সাটি সে নিজে ড্রাইভ
করে। তার শরীরে একটা ঢেউ খেলে গেল। হঠাৎ করে বলে উঠল,
— “অরে
ভাই,
একটু
জোরে
চালাও
না।”
— “আর
কেমনে
চালামু
স্যার!”
আরিফ দ্রুত ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে রিকশা ডেকে ওঠে পড়ল। মুহিত মনে হয় ভয়
পাচ্ছে। আরিফের ইচ্ছে করছে রিকশাটি সে নিজে ড্রাইভ করে। তার শরীরে একটা ঢেউ খেলে
গেল। হঠাৎ করে বলে উঠল, — “আরে ভাই, একটু জোরে চালাও না।”
— “আর কেমনে চালামু স্যার!”
বারান্দার রুমে কেউ আছে, এখনি এসে তাকে ধরবে এই ভেবে মুহিত গুটিসুটি হয়ে খাটের
এক কোণে বসে আছে। ঐ রুমের দরজা থেকে মুহূর্তের জন্য চোখের পলক পড়ছে না। চোখের পলক
পড়া মাত্র ভয়ংকর ব্যাপার ঘটে যাবে। হতে পারে চোখের পলক পড়া মাত্র একজন ভয়ংকর
চেহারার মানুষ কিংবা দৈত্য-দানব এসে তার সামনে দাঁড়াবে। একটা খট করে শব্দ হওয়ার
পর থেকে সে এভাবে বসে আছে। ইচ্ছে করছে সায়মনকে চিৎকার করে ডাকতে। ডাকলেই যে
সায়মন শুনবে এমন না। তার কান এখন দরজায় পড়ে আছে। বাবা এসে দরজায় নক করবে সেই
অপেক্ষায়। বাবা যে আজ কেন এত দেরি করছে?
আরিফ রিকশা ভাড়া মিটিয়ে দ্রুত উপরে উঠে এলো। কলিং বেল বাজতেই ছুটে গিয়ে
দরজা খুলে বাবাকে জড়িয়ে ধরল। আরিফ ছেলেকে বুকের সাথে মিশিয়ে রাখে,
— “ভয় পেয়েছিস?”
মুহিত মাথা নাড়ল।
— “বলেছিলাম না একা থাকতে পারবি না। ভয় পাবি। সায়মনদের এখানে চলে গেলে কী
হতো?”
মুহিত কোনো কথা না বলে বাবার বুকের সাথে লেপ্টে থাকে। আরিফ মুহিতের শরীরে
জ্বরও অনুভব করে।
— “তোর শরীরটা তো গরম।”
হ্যাঙ্গারের দিকে চোখ পড়তেই জিজ্ঞেস করল,
— “আমার প্যান্ট-শার্ট কোথায়?”
— “ধুয়ে দিয়েছি।”
আরিফ মিশ্র ভঙ্গিতে বলল,
— “এত দ্রুত বড় হতে নেই বোকা ছেলে। তুই পারিস কাপড় ধুতে?”
মধ্যরাতে মুহিতের জ্বর বাড়তে লাগল। কেঁপে কেঁপে জ্বর বাড়ছে। মুহিতের
মাথায় পানিধারা দেওয়ার ব্যবস্থা হলো। বালতি থেকে মগ দিয়ে পানি ঢালছে আরিফ।
মুহিত অস্পষ্টভাবে জিজ্ঞেস করল,
— “বাবা, মা কোথায়?”
আরিফ বুঝে না মুহিতের কথা। মুহিত আবার বলল,
— “তুমি নাকি মাকে এনে দিতে পারো? তাহলে এনে দিচ্ছ না কেন?”
আরিফ অবাক হয়ে বলল,
— “মাকে এনে দেবো কত্থেকে?”
পরক্ষণে ভাবল জ্বরে প্রলাপ বকছে ছেলেটা।
— “ম্যাডাম যে বলল।”
— “কি বলেছে ম্যাডাম?”
— “মা এনে দেওয়ার কথা।”
— “এই কথা বলেছে?”
— “বলো না বাবা, মাকে কবে এনে দিবে?”
— “তোর শরীরটা ভালো হোক তারপর। এখন এত কথা বলিস না, মাথা ব্যথা করবে।”
মুহিতকে ওষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়ানো হলো। ওষুধ খাওয়ার পর ঘাম দিয়ে জ্বর
ছাড়লেও সকাল থেকে আবার কেঁপে জ্বর উঠেছে। আরিফের দিশেহারা লাগে। সময় মত অফিসে
যেতে হবে, আজকে চট্টগ্রাম যাওয়ার কথা। বস তো কাল কোন কথাই শুনলেন না। এখন বললে কী
শুনবেন!
আরিফ পরে ভেবেছিল মুহিতকে নিয়ে চট্টগ্রাম যাবে। রুনা চলে যাওয়ার পর কোথাও
বেড়াতে যাওয়া হয়নি। এই সুযোগে মুহিতকে ঘুরিয়ে আনা যেত। এই অবস্থায় কোনোভাবেই
সম্ভব না। মুহিত উঠতে বসতে পারছে না। কাঁথা গায়ে লম্বা হয়ে শুয়ে আছে।
অফিসে যাওয়ার সময় চলে যাচ্ছে। উপায় না দেখে আরিফ বসকে ফোন করে বিস্তারিত
বলতে চাইল। তিনি পুরো কথা না শুনেই ফোন কেটে দিলেন। আরিফ ফোন হাতে নিয়েই বসে রইল।
বস বিশ্বাস করল বলে মনে হলো না। বস সব সময় ফাঁকির গন্ধ পান। আর তিনি মানুষটাও
বেতালের। মন-মর্জি বুঝা দায়। কখনো বলবেন, “কঠোর অনুশাসন না থাকলে অফিসের শৃঙ্খলা
থাকে না”। তখন খুব কড়াকড়ি করবেন। আবার কখনো সবাইকে নিয়ে চা-ও খাবেন। তখন বলবেন,
“শুধু কাজ করলেই হবে? জীবনে রিল্যাক্স যদি না থাকে, অর্থ উপার্জন করে লাভ কী?”
এখন মনে হচ্ছে কড়াকড়ি মুডে আছেন। বিষয়টি সহজ হবে না বলে মুহিতের কপালে
হাত রাখল। হাত পুড়ে যাওয়ার উপক্রম। একদিনেই বিছানায় লেগে গেছে। মুহিত চোখ টেনে
বলল,
— “বাবা, ক’টা বাজে? তুমি অফিসে যাবে না?”
আরিফের বিরক্ত লাগছে মুহিতের প্রশ্নে। বিরক্ত সামলে বলল,
— “তোকে ফেলে কী করে যাব? এখন উঠতে পারবি? মুখটা ধুয়ে কিছু খেয়ে ওষুধ খেলে
জ্বরটা ছেড়ে দিবে।”
মুহিত মুখ ধুয়ে ওষুধ খেল কিন্তু সন্ধ্যা পর্যন্ত জ্বর ছাড়ল না। মাঝে মাঝে
আরিফ রকিব সাহেবকে ফোন করল। ফোন ধরেই রকিব সাহেব উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন,
— “এটা আপনি কি করেছেন? এতটা হেয়ালি করা উচিত হয়নি আপনার। অফিসের অবস্থা
এখন গরম। কাকে চট্টগ্রাম পাঠাবে ঠিক করা হচ্ছে।”
— “ভাই, আমার ছেলেটার খুব জ্বর।”
— “তেলাপোকাও একটা পাখি আর জ্বরও একটা অসুখ? আপনি ইচ্ছে করলেই যেতে পারতেন।
দেখি, বুঝানোর চেষ্টা করছি স্যারকে।”
সন্ধ্যার পর রাশেদ এসে হাজির। রাশেদকে দেখে আরিফ অজানা আতঙ্কে বুকের ভিতর
মোচড় মারল।
— “রাশেদ, তুমি এই সময়?”
রাশেদ একটি খাম এগিয়ে দিয়ে বলল,
— “বড় স্যার পাঠাইছেন।”
— “কী এটা?”
— “জানি না। তবে ভালো কিছু মনে হয় না।”
আরিফ শঙ্কিত মনে খাম ধরে বলল,
— “রাশেদ বসো, চা খাও।”
— “সংবাদ চা খাওয়ার না। আজ চা খাব না।”
বিছানার দিকে তাকিয়ে বলল,
— “স্যার, এই আপনার ছেলে?”
— “হুঁ, ওর জ্বর।”
— “বড় কষ্ট আছে কপালে।”
রাশেদের কথা বোঝা গেল না। রাশেদ বেরিয়ে যেতে যেতে থামল। ইতস্তত করে আরিফের
মুখের দিকে তাকাল।
— “কিছু বলবে?”
রাশেদ না সূচক মাথা নাড়ল। রাশেদ বলতে চেয়েছিল বড় স্যার বলেছে আপনি যেন
কোনোদিন অফিসের দরজায় না যান। বড় স্যার বলেছে বলেই একজন ভদ্রলোককে এই কথা বলা
যায়? উনারা বড় স্যার বলতেই পারেন। আমি তো আর বড় স্যার না, পিয়ন। রাশেদ একবার
আরিফের মুখের দিকে তাকিয়ে দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেল।
আরিফের মন বলছে খামের ভিতর ভালো কিছু নেই। সে ধীরস্থিরে খাম খুলে স্তব্ধ
হয়ে বসে রইল। ভাবনার থেকেও ভয়ংকর কিছু ঘটে গেছে। তাকে ফায়ার করা হয়েছে।
এই সামান্য ব্যাপারে কাউকে ফায়ার করা যায় নাকি? কিন্তু কে করবে প্রতিবাদ?
কর্তার ইচ্ছাই ইচ্ছা। বসের কাছে ব্যাপারটা সামান্য ছিল না। তিনি ধরে নিয়েছেন
ছেলের অসুখের কথা হচ্ছে বাহানা। আসল কথা হচ্ছে সে যাবে না। তাই বানিয়ে মিথ্যে বলা
হয়েছে। তিনি মিথ্যে বলাটা মেনে নিতে পারছেন না।
রকিব সাহেবও বসের সাথে তাল মিলিয়ে বললেন,
— “না না, এটা আরিফ সাহেবের ঠিক হয়নি। কাল এত করে বুঝিয়ে দিলাম, তারপরও
এমনটা করা উচিত হয়নি।”
— “কিন্তু স্যার, আরিফ সাহেব তো মিথ্যে কথা বলার মানুষ না।”
— “তাহলে কী আমি মিথ্যে বলছি?”
— “ছিঃ ছিঃ স্যার, আপনি কেন মিথ্যে বলবেন?”
বস বললেন,
— “সে অবশ্যই মিথ্যে বলেছে। গতকালই আপত্তি করতে চেয়েছিল। আজ খাটিয়েছে
কৌশল। মানে কুবুদ্ধি। অসুখ-বিসুখ কিছু না। হারামি ভেবেছে আমাকে বলে লাভ হবে না তাই
আপনাকে সুপারিশ ধরেছে। বেটা হারামি আমার সাথে ফাজলামি! থাক ঘরে বসে।”
চাকরি হারিয়ে আরিফ কিছু চিন্তা করতে পারে না। সব অসাড় লাগে।
মুহিতের জ্বর ভালো হলো তিনদিন পর। বাবার আগে ঘুম থেকে জেগে মুহিত অনুভব করল,
সে আগের মতই আছে। গত তিনদিনের জ্বরের কোনো প্রভাব নেই। কিন্তু বাবার ব্যাপারটা আগের
মত নেই।
আরিফ সব সময় মুহিতের আগে ঘুম থেকে ওঠে। আজ মুহিত আগে উঠেছে। বাবাকে ডেকে
ঘুম ভাঙাল। আরিফ অলস দৃষ্টিতে মুহিতের দিকে তাকিয়ে থাকে।
— “বাবা, তুমি অফিসে যাবে না?”
ছেলেকে মিথ্যে বলবে না ভেবে আরিফ শান্ত স্বরে বলল,
— “আমার চাকরিটা নেই।”
মুহিত অনেক কঠিন কথা সহজে বুঝলেও মাঝে মাঝে অতি সহজ কথার অর্থ সে বুঝে না।
এইতো সেদিন মা এনে দেওয়ার ব্যাপারটা বুঝল না। মা এনে দেওয়ার ব্যাপারটা আজও তার
মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে কিনা কে জানে?
এখন বুঝতে পারছে না চাকরি নেই মানে কী? সে জিজ্ঞাসু চোখে বাবার মুখের দিকে
তাকিয়ে আছে।
আরিফ বলল,
— “আমার কাজকর্ম বড় স্যারের ভালো লাগছিল না। তাই আমাকে অফিসে যেতে নিষেধ
করেছে।”
— “তোমার কাজকর্ম মানে কী? তোমার অফিসে যেতে দেরি হওয়া?”
— “হুঁ, সেটাও আছে।”
মুহিতের মন খারাপ হয়ে গেল।
— “অফিসে না গেলে তুমি টাকা পাবে কোথায়?”
— “সেটাই তো ভাবছি।”
সময় নিয়ে মুহিতের কাঁধে হাত রেখে বলল,
— “তোর মা বেঁচে থাকলে এমন হতো না...”
বলার পর আরিফের দৃষ্টি বড় শূন্য লাগে। মায়ের কথা শুনে মুহিত ফ্যালফ্যাল
করে বাবার মুখের দিকে তাকায়। দীর্ঘ নিরবতা নেমে এলো।
নিরবতা ভেঙে মুহিত বলল,
— “তাহলে কী আমি আর স্কুলে যাব না?”
— “স্কুলে যাবি না কেন? অবশ্যই যাবি। ম্যাডাম কী তোকে স্কুলে যেতে না করেছে?
আজ থেকে আমি তোকে স্কুলে নিয়ে যাব, আবার বাসায় নিয়ে আসব। আজ স্কুল থেকে ফিরে
তোকে নিয়ে বেড়াতে যাব।”
— “কোথায় যাব?”
— “কোথায় যাব, তা তো ঠিক করিনি...” আরিফ দ্রুত ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে রিকশা
ডেকে ওঠে পড়ল। মুহিত মনে হয় ভয় পাচ্ছে। আরিফের ইচ্ছে করছে রিকশাটি সে নিজে
ড্রাইভ করে। তার শরীরে একটা ঢেউ খেলে গেল। হঠাৎ করে বলে উঠল, — “আরে ভাই, একটু
জোরে চালাও না।”
— “আর কেমনে চালামু স্যার!”
বারান্দার রুমে কেউ আছে, এখনি এসে তাকে ধরবে এই ভেবে মুহিত গুটিসুটি হয়ে
খাটের এক কোণে বসে আছে। ঐ রুমের দরজা থেকে মুহূর্তের জন্য চোখের পলক পড়ছে না।
চোখের পলক পড়া মাত্র ভয়ংকর ব্যাপার ঘটে যাবে। হতে পারে চোখের পলক পড়া মাত্র
একজন ভয়ংকর চেহারার মানুষ কিংবা দৈত্য-দানব এসে তার সামনে দাঁড়াবে। একটা খট করে শব্দ
হওয়ার পর থেকে সে এভাবে বসে আছে। ইচ্ছে করছে সায়মনকে চিৎকার করে ডাকতে। ডাকলেই
যে সায়মন শুনবে এমন না। তার কান এখন দরজায় পড়ে আছে। বাবা এসে দরজায় নক করবে
সেই অপেক্ষায়। বাবা যে আজ কেন এত দেরি করছে?
আরিফ রিকশা ভাড়া মিটিয়ে দ্রুত উপরে উঠে এলো। কলিং বেল বাজতেই ছুটে গিয়ে
দরজা খুলে বাবাকে জড়িয়ে ধরল। আরিফ ছেলেকে বুকের সাথে মিশিয়ে রাখে,
— “ভয় পেয়েছিস?”
মুহিত মাথা নাড়ল।
— “বলেছিলাম না একা থাকতে পারবি না। ভয় পাবি। সায়মনদের এখানে চলে গেলে কী
হতো?”
মুহিত কোনো কথা না বলে বাবার বুকের সাথে লেপ্টে থাকে। আরিফ মুহিতের শরীরে
জ্বরও অনুভব করে।
— “তোর শরীরটা তো গরম।”
হ্যাঙ্গারের দিকে চোখ পড়তেই জিজ্ঞেস করল,
— “আমার প্যান্ট-শার্ট কোথায়?”
— “ধুয়ে দিয়েছি।”
আরিফ মিশ্র ভঙ্গিতে বলল,
— “এত দ্রুত বড় হতে নেই বোকা ছেলে। তুই পারিস কাপড় ধুতে?”
মধ্যরাতে মুহিতের জ্বর বাড়তে লাগল। কেঁপে কেঁপে জ্বর বাড়ছে। মুহিতের
মাথায় পানিধারা দেওয়ার ব্যবস্থা হলো। বালতি থেকে মগ দিয়ে পানি ঢালছে আরিফ।
মুহিত অস্পষ্টভাবে জিজ্ঞেস করল,
— “বাবা, মা কোথায়?”
আরিফ বুঝে না মুহিতের কথা। মুহিত আবার বলল,
— “তুমি নাকি মাকে এনে দিতে পারো? তাহলে এনে দিচ্ছ না কেন?”
আরিফ অবাক হয়ে বলল,
— “মাকে এনে দেবো কত্থেকে?”
পরক্ষণে ভাবল জ্বরে প্রলাপ বকছে ছেলেটা।
— “ম্যাডাম যে বলল।”
— “কি বলেছে ম্যাডাম?”
— “মা এনে দেওয়ার কথা।”
— “এই কথা বলেছে?”
— “বলো না বাবা, মাকে কবে এনে দিবে?”
— “তোর শরীরটা ভালো হোক তারপর। এখন এত কথা বলিস না, মাথা ব্যথা করবে।”
মুহিতকে ওষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়ানো হলো। ওষুধ খাওয়ার পর ঘাম দিয়ে জ্বর
ছাড়লেও সকাল থেকে আবার কেঁপে জ্বর উঠেছে। আরিফের দিশেহারা লাগে। সময় মত অফিসে
যেতে হবে, আজকে চট্টগ্রাম যাওয়ার কথা। বস তো কাল কোন কথাই শুনলেন না। এখন বললে কী
শুনবেন!
আরিফ পরে ভেবেছিল মুহিতকে নিয়ে চট্টগ্রাম যাবে। রুনা চলে যাওয়ার পর কোথাও
বেড়াতে যাওয়া হয়নি। এই সুযোগে মুহিতকে ঘুরিয়ে আনা যেত। এই অবস্থায় কোনোভাবেই
সম্ভব না। মুহিত উঠতে বসতে পারছে না। কাঁথা গায়ে লম্বা হয়ে শুয়ে আছে।
অফিসে যাওয়ার সময় চলে যাচ্ছে। উপায় না দেখে আরিফ বসকে ফোন করে বিস্তারিত
বলতে চাইল। তিনি পুরো কথা না শুনেই ফোন কেটে দিলেন। আরিফ ফোন হাতে নিয়েই বসে রইল।
বস বিশ্বাস করল বলে মনে হলো না। বস সব সময় ফাঁকির গন্ধ পান। আর তিনি মানুষটাও
বেতালের। মন-মর্জি বুঝা দায়। কখনো বলবেন, “কঠোর অনুশাসন না থাকলে অফিসের শৃঙ্খলা
থাকে না”। তখন খুব কড়াকড়ি করবেন। আবার কখনো সবাইকে নিয়ে চা-ও খাবেন। তখন বলবেন,
“শুধু কাজ করলেই হবে? জীবনে রিল্যাক্স যদি না থাকে, অর্থ উপার্জন করে লাভ কী?”
এখন মনে হচ্ছে কড়াকড়ি মুডে আছেন। বিষয়টি সহজ হবে না বলে মুহিতের কপালে
হাত রাখল। হাত পুড়ে যাওয়ার উপক্রম। একদিনেই বিছানায় লেগে গেছে। মুহিত চোখ টেনে
বলল,
— “বাবা, ক’টা বাজে? তুমি অফিসে যাবে না?”
আরিফের বিরক্ত লাগছে মুহিতের প্রশ্নে। বিরক্ত সামলে বলল,
— “তোকে ফেলে কী করে যাব? এখন উঠতে পারবি? মুখটা ধুয়ে কিছু খেয়ে ওষুধ খেলে
জ্বরটা ছেড়ে দিবে।”
মুহিত মুখ ধুয়ে ওষুধ খেল কিন্তু সন্ধ্যা পর্যন্ত জ্বর ছাড়ল না। মাঝে মাঝে
আরিফ রকিব সাহেবকে ফোন করল। ফোন ধরেই রকিব সাহেব উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন,
— “এটা আপনি কি করেছেন? এতটা হেয়ালি করা উচিত হয়নি আপনার। অফিসের অবস্থা
এখন গরম। কাকে চট্টগ্রাম পাঠাবে ঠিক করা হচ্ছে।”
— “ভাই, আমার ছেলেটার খুব জ্বর।”
— “তেলাপোকাও একটা পাখি আর জ্বরও একটা অসুখ? আপনি ইচ্ছে করলেই যেতে পারতেন।
দেখি, বুঝানোর চেষ্টা করছি স্যারকে।”
সন্ধ্যার পর রাশেদ এসে হাজির। রাশেদকে দেখে আরিফ অজানা আতঙ্কে বুকের ভিতর
মোচড় মারল।
— “রাশেদ, তুমি এই সময়?”
রাশেদ একটি খাম এগিয়ে দিয়ে বলল,
— “বড় স্যার পাঠাইছেন।”
— “কী এটা?”
— “জানি না। তবে ভালো কিছু মনে হয় না।”
আরিফ শঙ্কিত মনে খাম ধরে বলল,
— “রাশেদ বসো, চা খাও।”
— “সংবাদ চা খাওয়ার না। আজ চা খাব না।”
বিছানার দিকে তাকিয়ে বলল,
— “স্যার, এই আপনার ছেলে?”
— “হুঁ, ওর জ্বর।”
— “বড় কষ্ট আছে কপালে।”
রাশেদের কথা বোঝা গেল না। রাশেদ বেরিয়ে যেতে যেতে থামল। ইতস্তত করে আরিফের
মুখের দিকে তাকাল।
— “কিছু বলবে?”
রাশেদ না সূচক মাথা নাড়ল। রাশেদ বলতে চেয়েছিল বড় স্যার বলেছে আপনি যেন
কোনোদিন অফিসের দরজায় না যান। বড় স্যার বলেছে বলেই একজন ভদ্রলোককে এই কথা বলা
যায়? উনারা বড় স্যার বলতেই পারেন। আমি তো আর বড় স্যার না, পিয়ন। রাশেদ একবার
আরিফের মুখের দিকে তাকিয়ে দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেল।
আরিফের মন বলছে খামের ভিতর ভালো কিছু নেই। সে ধীরস্থিরে খাম খুলে স্তব্ধ
হয়ে বসে রইল। ভাবনার থেকেও ভয়ংকর কিছু ঘটে গেছে। তাকে ফায়ার করা হয়েছে।
এই সামান্য ব্যাপারে কাউকে ফায়ার করা যায় নাকি? কিন্তু কে করবে প্রতিবাদ?
কর্তার ইচ্ছাই ইচ্ছা। বসের কাছে ব্যাপারটা সামান্য ছিল না। তিনি ধরে নিয়েছেন
ছেলের অসুখের কথা হচ্ছে বাহানা। আসল কথা হচ্ছে সে যাবে না। তাই বানিয়ে মিথ্যে বলা
হয়েছে। তিনি মিথ্যে বলাটা মেনে নিতে পারছেন না।
রকিব সাহেবও বসের সাথে তাল মিলিয়ে বললেন,
— “না না, এটা আরিফ সাহেবের ঠিক হয়নি। কাল এত করে বুঝিয়ে দিলাম, তারপরও
এমনটা করা উচিত হয়নি।”
— “কিন্তু স্যার, আরিফ সাহেব তো মিথ্যে কথা বলার মানুষ না।”
— “তাহলে কী আমি মিথ্যে বলছি?”
— “ছিঃ ছিঃ স্যার, আপনি কেন মিথ্যে বলবেন?”
বস বললেন,
— “সে অবশ্যই মিথ্যে বলেছে। গতকালই আপত্তি করতে চেয়েছিল। আজ খাটিয়েছে
কৌশল। মানে কুবুদ্ধি। অসুখ-বিসুখ কিছু না। হারামি ভেবেছে আমাকে বলে লাভ হবে না তাই
আপনাকে সুপারিশ ধরেছে। বেটা হারামি আমার সাথে ফাজলামি! থাক ঘরে বসে।”
চাকরি হারিয়ে আরিফ কিছু চিন্তা করতে পারে না। সব অসাড় লাগে।
মুহিতের জ্বর ভালো হলো তিনদিন পর। বাবার আগে ঘুম থেকে জেগে মুহিত অনুভব করল,
সে আগের মতই আছে। গত তিনদিনের জ্বরের কোনো প্রভাব নেই। কিন্তু বাবার ব্যাপারটা
আগের মত নেই।
আরিফ সব সময় মুহিতের আগে ঘুম থেকে ওঠে। আজ মুহিত আগে উঠেছে। বাবাকে ডেকে
ঘুম ভাঙাল। আরিফ অলস দৃষ্টিতে মুহিতের দিকে তাকিয়ে থাকে।
— “বাবা, তুমি অফিসে যাবে না?”
ছেলেকে মিথ্যে বলবে না ভেবে আরিফ শান্ত স্বরে বলল,
— “আমার চাকরিটা নেই।”
মুহিত অনেক কঠিন কথা সহজে বুঝলেও মাঝে মাঝে অতি সহজ কথার অর্থ সে বুঝে না। এইতো সেদিন মা এনে দেওয়ার ব্যাপারটা বুঝল না। মা এনে দেওয়ার ব্যাপারটা আজও তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে কিনা কে জানে?
এখন বুঝতে পারছে না চাকরি নেই মানে কী? সে জিজ্ঞাসু চোখে বাবার মুখের দিকে
তাকিয়ে আছে।
আরিফ বলল,
— “আমার কাজকর্ম বড় স্যারের ভালো লাগছিল না। তাই আমাকে অফিসে যেতে নিষেধ
করেছে।”
— “তোমার কাজকর্ম মানে কী? তোমার অফিসে যেতে দেরি হওয়া?”
— “হুঁ, সেটাও আছে।”
মুহিতের মন খারাপ হয়ে গেল।
— “অফিসে না গেলে তুমি টাকা পাবে কোথায়?”
— “সেটাই তো ভাবছি।”
সময় নিয়ে মুহিতের কাঁধে হাত রেখে বলল,
— “তোর মা বেঁচে থাকলে এমন হতো না...”
বলার পর আরিফের দৃষ্টি বড় শূন্য লাগে। মায়ের কথা শুনে মুহিত ফ্যালফ্যাল
করে বাবার মুখের দিকে তাকায়। দীর্ঘ নিরবতা নেমে এলো।
নিরবতা ভেঙে মুহিত বলল,
— “তাহলে কী আমি আর স্কুলে যাব না?”
— “স্কুলে যাবি না কেন? অবশ্যই যাবি। ম্যাডাম কী তোকে স্কুলে যেতে না করেছে?
আজ থেকে আমি তোকে স্কুলে নিয়ে যাব, আবার বাসায় নিয়ে আসব। আজ স্কুল থেকে ফিরে
তোকে নিয়ে বেড়াতে যাব।”
— “কোথায় যাব?”
— “কোথায় যাব, তা তো ঠিক করিনি...”

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন