সুখ সুদূরে (৭ম পর্ব) বাংলা উপন্যাস – নিঃসঙ্গতার প্রতিধ্বনি ও মুহিতের বড় হয়ে ওঠা

 



Meta Description (SEO সারাংশ):

সুখ সুদূরে উপন্যাসের ৭ম পর্বে দেখা যায় মা হারা শিশুর একাকীত্ব, বাবার দ্বিধা আর সমাজের বাস্তবতা। আধুনিক বাংলা সাহিত্যপ্রেমীদের জন্য এক আবেগময় গল্প।

Keywords: সুখ সুদূরে, বাংলা উপন্যাস, মা হারা শিশু, একাকীত্বের গল্প, আধুনিক বাংলা সাহিত্য, আরিফ ও মুহিত, আবেগময় গল্প


সুখ সুদূরে – ৭ম পর্ব

– নিঃসঙ্গতার প্রতিধ্বনি ও মুহিতের বড় হয়ে ওঠা

শাহানা বেগম মুহিতকে স্কুল থেকে এনে নিজের কাছে রাখছেন এক মাস কেটে গেছে।
প্রথমদিকে মানবিক দায়িত্ববোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে যে আশ্রয় দিয়েছিলেন, এখন যেন সেটাই হয়ে উঠেছে একধরনের বোঝা। প্রতিদিন রিকশা ভাড়ার হিসেব, বাজার-রান্নায় অতিরিক্ত ঝামেলা, বিকেলের নাস্তার সময়ে সায়মনকে দিলে মুহিতকে না দিয়ে উপায় নেই—নাহয় সায়মন মুখ গোমড়া করে খেতেই চায় না। এক-দুদিন হলে কথা ছিল, কিন্তু এক মাস ধরে এভাবে চলা কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছে।

তার উপর আছে মোমেনার নিত্যকথা। শরীর দুলিয়ে, হাত ছুঁড়ে বলবে—
“ভাবী, নিমাত্রা পোলাপাইন বহুত শয়তান হয়। মুখ করে বোঝায় না, তলে তলে সব বোঝে। হেইদিন দেখলেন না? ডিম না পেয়ে কী করল সায়মন! আর এখন তো রুটিনও ঠিক নাই। সবই ওই পোলার কারণে। বউ মরছে, একটা বিয়ে করলেই তো হয়! পোলারে মানুষরে ঘরে রাখার কী দরকার!”

মোমেনার কথা শুনতে খারাপ লাগে বটে, কিন্তু শাহানা বেগম সেসব পুরোপুরি অযৌক্তিকও মনে করেন না।
আরিফ প্রতিদিন অফিস শেষে ছেলেকে নিয়ে যান, ফিরে এসে কিছু জিজ্ঞেস করেন না। যেন সবকিছু স্বাভাবিক। অথচ শাহানা বেগমের মনে হয়, এক ধরনের দায়িত্বহীনতা কাজ করছে।

ইচ্ছে করে মুখের ওপর বলতেন—
“আপনি নিশ্চিন্তে অফিস করেন, আর আমি ফেঁসে গেলাম! আমার ভদ্রতা আমি দেখাচ্ছি, আপনি অন্তত সম্মান রাখেন!”

আজ স্থির করেছেন, মুখোমুখি কিছু বলবেন।


খেলার আহ্বান ও নিরব প্রতিক্রিয়া

অন্যদিকে মুহিত চুপচাপ বসে আছে। সায়মন এসে বলল, “চল, নতুন একটা খেলা খেলি।”
মুহিত মাথা নাড়ল—না।
ভিতরের ঘর থেকে শাহানা বেগম কড়া গলায় ডাক দিলেন,
“সায়মন, হাত-মুখ ধুয়ে পড়তে বস।”
সায়মন ধীরে ধীরে মাথা নিচু করে ওয়াশরুমের দিকে গেল। মুহিত বাবার অপেক্ষায় রইল।

ঠিক সময়ে কলিং বেল বেজে উঠল।
শাহানা বেগম দরজা খুললেন—মুখে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট।
আরিফ কুশল জিজ্ঞেস করলেন, “ভাবী, কেমন আছেন?”
“ভালো।”
আরিফ একটু ইতস্তত করে বললেন, “ভাবী, একটা কথা বলতে চাচ্ছিলাম... থাক, আরেকদিন বলব।”
মুহিতকে নিয়ে চুপচাপ বেরিয়ে গেলেন আরিফ।
শাহানা বেগম দরজা বন্ধ করলেন—দরজার শব্দটাও যেন ভিন্নরকম লাগল।

আসলে আজ আরিফ বলতে চেয়েছিলেন, মুহিতের জন্য কিছু খরচ দিতে চান।
কিন্তু টাকা যখন ভালোবাসার পরিবর্তে ব্যবহৃত হয়, তখন তা অপমানের মতো লাগে। তাই বললেন না।


নিঃশব্দ রাতে বাবা-ছেলের সংলাপ

রাত গভীর হলে মুহিত বাবার বুকে হাত রেখে ঘুমিয়ে পড়ে।
আরিফ তার দিকে তাকিয়ে বলেন,
“স্কুলে যেতে কেমন লাগে?”
“ভালো।”
“সায়মনদের বাসায় থাকতে নিশ্চয় আরও ভালো লাগে?”
মুহিত চুপ করে থাকে। তারপর বলে,
“বাবা, তুমি কি কাজের লোক পেয়েছ?”
“না রে, বিশ্বস্ত লোক পাওয়া সহজ নয়।”
একটু থেমে আরিফ জিজ্ঞেস করেন,
“তোকেই কি কিছু বলেছে কেউ?”
“না।”
“তবে হঠাৎ এ প্রশ্ন করলি কেন?”
“আন্টি মনে হয় আমার থাকাটা পছন্দ করছেন না। আমার ভালো লাগে না আর এখানে।”

আরিফ চুপ করে থাকেন। কথাগুলো তার কানে ধাক্কা দেয়।
তিনিও বুঝতে পেরেছেন—শাহানা বেগমের হাসিতে একটা কৃত্রিমতা আছে।

অবশেষে মুহিত নিজেই বলে—
“বাবা, আমি ঘরে থাকতে পারব।”
আরিফের মনে সন্দেহ জাগে—একা থাকতে পারবে?


সিদ্ধান্তের সকাল

সকালে ঘুম ভাঙতেই প্রথম কথা,
“তুই সত্যিই একা থাকতে পারবি?”
“পারব।”
আরিফ জিজ্ঞেস করেন,
“তবে এখনও ভেবে দেখ, সায়মনদের বাসায় থাকতে চাস?”
মুহিত মাথা নাড়িয়ে অস্বীকার করে।

আরিফ বলে,
“সায়মনের মা যদি জিজ্ঞেস করে, কেন চলে আসলি?”
মুহিত একটু ভেবে উত্তর দেয়,
“বলব, বাবা বলেছে বাসায় থাকার অভ্যাস করতে। না পারলে যেন আপনাদের বাসায় যেতে বলেছে।”

আরিফ বিস্ময়ে ছেলের দিকে তাকিয়ে থাকেন।
মাত্র ক’মাস আগে যে ছেলেটা মায়ের আঁচল না পেলে চলতো না, সে আজ বুঝে গেছে পরিস্থিতি। নিজের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
আরিফের মনে পড়ে—
"মা হারা শিশুদের সময়ের আগেই বড় হয়ে যেতে হয়।"


জজু মিয়ার রিকশায়

আরিফ অফিসের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
শেষবারের মতো এসে বলেন,
“আজ তোর পরীক্ষা। সব খাবার টেবিলে রাখা আছে। স্কুল থেকে ফিরে সময়মতো খেয়ে নিস। সমস্যা হলে ফোন করিস।”
চাবি এগিয়ে দিয়ে বলেন,
“তালা খুলতে পারবি তো?”
“পারব।”
আরিফ একবার পরখ করে নিল। মুহিত সত্যিই খুলে ফেলেছে।

ছেলের চুলে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
“চল, আর দেরি করা যাবে না।”
গেটের সামনে জজু মিয়া রিকশা নিয়ে দাঁড়িয়ে।
ওকে দেখে আরিফ হাঁফ ছেড়ে বলল,
“ওহ জজু ভাই, তুমি যেন আমাকে বাঁচিয়েই দিলে! তোমাকে সময়মতো পেয়ে অনেক উপকার হলো। চল, দেরি হয়ে যাচ্ছে।”

রিকশায় উঠে তাড়াতাড়ি চালাতে বলল।
জজু মিয়া মাথা নেড়ে বলল,
“আরেকটু সহালে বাইর হইলেই পারতেন।”
আরিফ হালকা হাসিতে বলল,
“সব চেষ্টাই করেছি। সময়ের সাথে পারি না। জজু মিয়া, তুমি কি প্রতিদিন ওকে স্কুলে আনা-নেওয়া করতে পারবে?”
“পারমু। কিন্তু রোজ পারমু না। বড় ভাড়া পাইলে দূরে যাইতে হয়।”

“তাহলে তো সমস্যা। হঠাৎ একদিন বলবে পারবে না—তখন আমি কী করব? এখন তো পৃথিবীর সবকিছুই অসম্ভব মনে হচ্ছে। খুব জটিল সবকিছু। প্রয়োজনে তোমাকে ফোন করব।”
“আইচ্ছা, আমার নতুন নাম্বারডাও রাইখেন।”
“আবার নতুন নাম্বার? ঠিক আছে, সব নাম্বার দাও, দরকার হলে তোমার নাম্বারের জন্য একটা ডায়েরি কিনব! এখন চালাও তাড়াতাড়ি।”


নিঃসঙ্গ দুপুর ও কল্পনার মা

অফিসে এসেও আরিফের অস্থিরতা কাটছে না।
বারবার মনে পড়ছে মুহিতের কথা। হঠাৎ ভাবনায় আসে—হয়তো সায়মন আজ স্কুলে যায়নি, মুহিতও বাসায় ফিরতে পারেনি। সারাদিন একা স্কুলে বসে থেকেছে। স্কুল ছুটির পর এক কোণে বসে কাঁদছে।

আরিফের মুখ বিবর্ণ হয়ে আসে।
ধুর! এসব কল্পনা করছি কেন?
কিছু হলে নিশ্চয়ই স্কুল থেকে ফোন আসত।


মুহিতের বাসায় ফেরা

মুহিত শাহানা বেগমের সাথেই স্কুল থেকে ফিরেছে।
সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে সায়মন বলল, “আজ এক নতুন খেলা খেলব।”
মুহিত কোনো সাড়া দিল না।

তিন তলায় পৌঁছে মুহিত বাসার দিকে এগোতে থাকলে শাহানা বেগম জিজ্ঞেস করলেন,
“মুহিত, কোথায় যাচ্ছ?”
মুহিত মুখ ফিরিয়ে মাথা নিচু করে বলল,
“বাবা বলেছেন বাসায় থাকার অভ্যাস করতে।”
“থাকতে পারবে?”
“পারব। বাবা বলেছেন, না পারলে আপনাদের কাছে চলে আসব।”

শাহানা বেগম মনে মনে ভাবলেন, কাল রাতে কি এই কথাটাই বলতে চেয়েছিলেন আরিফ?

“মুহিত আমাদের এখানে থাকবে না?” সায়মন মাকে জিজ্ঞেস করল।
কেউ কোনো উত্তর দিল না।
মুহিত তালা খুলে বাসায় ঢুকল। দরজা বন্ধ করার আগে একবার সায়মনের দিকে তাকাল।
সায়মন কিছুটা বিষণ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মুহিত দরজা বন্ধ করে দিল।


মায়ের ছবি, ম্যাডাম আর এক অলৌকিক দুপুর

স্কুলড্রেস খুলতে খুলতে মুহিতের মনে পড়ল ঝুমুর ম্যাডামের কথা।
তিনি স্নেহভরে কাছে এসে বলেছিলেন,
“মুহিত, তোমার ড্রেসটা বেশ ময়লা হয়েছে। পরিষ্কার পোশাক পরে আসবে।”
“বাবা সময় পাচ্ছেন না।”
“ও, সব কাজ তোমার বাবা করেন?”
“হ্যাঁ।”
“বাসায় কাজের লোক নেই?”
“না, পাওয়া যাচ্ছে না।”
“তুমি একা থাকো?”
“আজ থেকে থাকব।”

ম্যাডাম কিছুটা দুঃখ প্রকাশ করে বললেন,
“এই বয়সে মা ছাড়া থাকা খুব কষ্টের। তোমার একজন মা দরকার। বাবাকে বলো যেন তোমার জন্য একজন মা এনে দেন। ভাগ্য ভালো হলে ভালোই হবে।”
“বাবা মা কোথায় পাবেন?”
ম্যাডাম মুচকি হেসে বললেন,
“তোমার বাবাকে শুধু এটুকু বলো, আমাকে একটা মা এনে দাও।”

এই সরল কথাটা মুহিতের কাছে রহস্যময় ঠেকল।
‘মা কোথায় পাওয়া যায়?’—এই প্রশ্ন নিয়ে সে চলে এল মায়ের ছবির সামনে।
“মা, যদি তোমাকে পাওয়া যায়, তাহলে বাবা কেন এনে দিচ্ছেন না? সত্যি কি, মা মারা গেলে তাকে আর ফিরে পাওয়া যায় না?”


কল্পনার মা

সে বারান্দার পাশের ঘরে চলে এলো—যেখানে রুনার জিনিসপত্র এখনো আগের মতো গুছানো।
ড্রেসিং টেবিলে পড়ে থাকা প্রসাধনীগুলোর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে মুহিত সব পরিষ্কার করে গুছিয়ে রাখল।

তার মনে এক ধরনের অদ্ভুত ভালোলাগা কাজ করছিল।
ম্যাডামের মুখে ‘মা’–এর কথা শুনে সে কল্পনায় মায়ের আগমন কাহিনি সাজায়। রুনা একটি লাল ব্যাগ হাতে গেইটের বাইরে দাঁড়িয়ে।
স্কুল থেকে ফিরে মুহিত মাকে ভিতরে নিয়ে আসে।
এখন সে বারান্দার বেতের চেয়ারে বসে আছে—মা ডাকবেন, “মুহিত, নাস্তাটা খেয়ে নে, তারপর গোসল।”


একলা দুপুরে দায়িত্বশীলতা

বাইরে শুরু হলো ঝমঝম বৃষ্টি।
বৃষ্টির পানি কচুপাতায় জমে ওঠে, আবার পাতাটি তা ঝেড়ে ফেলে।
কিছুক্ষণ স্বচ্ছ জলে হীরার মত আলো পড়ে ঝিলমিল করে।
জল ও পাতার এই খেলায় মুহিত মায়ের ভাবনায় ডুবে যায়। কল্পনার ঘর ভেঙে পড়ে।

বিছানায় পড়ে থাকা ময়লা স্কুলড্রেস, বাবার মোজা আর শার্ট–প্যান্ট—সব ডিটারজেন্টে ভিজিয়ে দিল।
কাপড় ধুয়ে ঠান্ডা পানিতে গোসল সেরে টেবিলে বসে খেতে গিয়ে দেখে, তার আঙুলের অগ্রভাগ যেন বুড়ো মানুষের আঙুল হয়ে গেছে।
তবুও বাবার দেখানো মতই খাওয়া শেষ করে।


বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যার উদ্বেগ

দুপুরে খেতে বসে আরিফের মনে হচ্ছিল মুহিত হয়তো আজ খাবে না, খাওয়ার প্লেট এলোমেলো করে বসে থাকবে।
বৃষ্টির কারণে দ্রুত সন্ধ্যা নেমে এসেছে, অথচ এখনো দিনের অনেকটা বাকি।
বাইরে অন্ধকার।

আরিফ ভাবছে, ছেলেটা নিশ্চয়ই মন খারাপ করে একা বসে আছে।
বৃষ্টির দিনে এমন অনুভূতির জন্ম হতেই পারে।

বেশ উদ্বেগ নিয়ে পিয়ন রাশেদকে বলল,
“এক কাপ চা দাও।”
রাশেদ টি মেকার থেকে গরম চা এনে দেয়।

আরিফের পছন্দ—কড়া মিষ্টি, গাঢ় রঙের চা।
চুমুক দিতে দিতে ভাবছে—সবকিছু ঠিক আছে তো?
মনে হচ্ছে মুহিত হয়তো ইলেকট্রিক শকে পড়ে গেছে, মাটিতে পড়ে আছে।

চিন্তা সরাতে পারছে না কিছুতেই।

হঠাৎ রাশেদ এসে বলল,
“স্যার, বড় সাহেব আপনাকে দেখা করতে বলেছেন।”

আরিফ চমকে উঠল।
“আমাকে? কেন?”



📢 মন্তব্য করুন

এই উপন্যাসের পরবর্তী পর্ব পেতে “সুখ-সুদূরে” ব্লগটি নিয়মিত পড়ুন।

আপনার মতামত আমাদের অনুপ্রেরণা জোগাবে।


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

সুখ সুদূরে (প্রথম পর্ব) | বাংলা উপন্যাস | আশিষ কৃষ্ণমুখ

সুখ সুদূরে ( ২য় পর্ব) বাংলা উপন্যাস। আশিষ কৃষ্ণমুখ

সুখ সুদূরে (৪র্থ পর্ব) বাংলা উপন্যাস। আশিষ কৃষ্ণমুখ