সুখ সুদূরে (৬ষ্ঠ পর্ব ) বাংলা উপন্যাস। আশিষ কৃষ্ণমুখ
সুখ সুদূরে – ৬ষ্ঠ পর্ব
Bangla Short Story | বাংলা গল্প | Bengali Family Drama
এক শূন্য ঘরের অনুভব
ঘরটা আজ অস্বাভাবিক অন্ধকার লাগছে। যেদিকেই চোখ যায়, বুকের ভেতর একটা অদৃশ্য হাতুড়ি ঠকঠক করে বাজতে থাকে। এমন অনুভূতি এতক্ষণ ছিল না। ঘর ছিল ভরপুর মানুষে—পড়শি, সহকর্মী, শুভাকাঙ্ক্ষী। এখন তারা নেই, যেন কেউ হঠাৎ বাতি নিভিয়ে দিয়ে চলে গেছে। চারপাশ নিঃশব্দ, নির্জন।
একটা মানুষ কতটা জায়গা জুড়ে ছিল, সেই হিসাব মিলাতে চেষ্টা করছে। অথচ রুনার ঘর ছেড়ে চলে যাওয়া তো আজকের নয়—দু’মাস আগে শেষযাত্রা হয়েছিল তার। তবুও একদিনের জন্যও আরিফের মনে হয়নি যে রুনা ঘরে নেই। সর্বত্রই রুনার উপস্থিতি অনুভব করত সে। কিন্তু রুনার দেহখানি পৃথিবীর আবরণে আবৃত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যেন সৃষ্টি হয়েছে এক গভীর শূন্যতা, নিভে গেছে আলোও।
মুহিতের প্রশ্ন আরিফের নীরবতা
মন হয়তো এমনই—প্রিয়জন বেঁচে থাকলে সে যত দূরেই থাকুক, মনে হয় সে আছে। কিন্তু মরে গেলে যেন কোথাও থাকে না, কেউ থাকে না। সব শূন্য লাগে, ফাঁকা লাগে।
সেই শূন্যতা বুকে নিয়েই আরিফ আর মুহিত বসে থাকে—একজন সোফায়, আরেকজন খাটে।
আরিফ ছেলেকে কাছে ডাকলে, মুহিত নিঃশব্দে বাবার কাছে আসে।
মুহিত বলল,
— বাবা, মা তো বলেছিল ভালো হয়ে যাবে… তাহলে এখন কে আমার চুলে বিলি দেবে?
এই প্রশ্নের উত্তর আরিফের কাছে নেই, সে ছেলেকে বুকের মাঝে চেপে ধরে রাখে। দুটি বুকের মৃদু কম্পনে এক নিদারুণ শৈল্পিকতা প্রকাশ পায়—নৈঃশব্দিক ক্রন্দনশিল্প। এই শৈল্পিকতায়ই কেটে যায় তাদের দিনরাত্রি।
এক প্রতিবেশী সমাধান
এক সন্ধ্যায় আরিফ মুহিতের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
“আমার ছুটি শেষ। কাল থেকে অফিসে যেতে হবে। তোকে কী করব বলতো?”
এরকম দায়িত্ববোধের প্রশ্ন এর আগে মুহিতের সামনে কখনো আসেনি।
আরিফ বলল,
“চল, সায়মনদের বাসায় যাই।”
পাশের ফ্ল্যাটে থাকে সায়মনরা। দরজা খুললেন সায়মনের মা, শাহানা বেগম।
ভেতরে গিয়ে বসার পর আরিফ বলেন,
— “ভাবি, আপনি সবই তো জানেন। কাল থেকে অফিস শুরু আমার। ছেলেটা ছোট, এখনও সামলে উঠতে পারেনি... আপনি যদি স্কুল শেষে ওকে সায়মনের সাথে নিয়ে এসে কিছুক্ষণ আপনার কাছে রাখতেন… আমি নিশ্চিন্তে অফিস করতে পারতাম।”
শাহানা বেগম বিনয়ের সঙ্গে রাজি হন।
সায়মন উচ্ছ্বসিত হয়, কিন্তু মুহিত নিরুত্তর।
পরিবর্তনের নতুন রুটিন
পরদিন সকালে নতুন দায়িত্বে অবতীর্ণ হয় আরিফ। রান্না, নাস্তা, গোসল, স্কুলের প্রস্তুতি সবই তার উপর।
রিকশায় বসে আরিফ বলল,
“পৃথিবীটা বদলে গেছে। আমাদের নতুনভাবে চলতে শিখতে হবে… ‘পারব না’ শব্দটা মুছে ফেলতে হবে।”
স্কুলে পৌঁছে মুহিত অনুভব করে সবার করুণ দৃষ্টি। সহপাঠীদের সহানুভূতি আর শিক্ষিকার কৌতূহল যেন এক মানসিক ক্লান্তি তৈরি করে।
সায়মনের বাড়িতে একটি দুর্ঘটনা
স্কুল শেষে মুহিত যায় সায়মনের বাড়ি। ভাত খাওয়াও, ঘুমানো—সব নতুন অভিজ্ঞতা।
কিন্তু দুপুরবেলা সায়মনের ড্রইংরুমে ক্রিকেট খেলতে গিয়ে বলের আঘাতে ভেঙে যায় কেবিনেটের গ্লাস।
শাহানা বেগম নীরব থাকলেও মুহিতের মন খারাপ হয়।
সে মনে মনে বলে, “আমার দোষ কী? বল তো মেরেছে সায়মন।”
বাবার কাছে স্বীকারোক্তি
সন্ধ্যায় ফিরে আরিফ ছেলেকে জিজ্ঞেস করে দুপুরবেলার ঘটনা। মুহিত সব সত্য বলে—নিজেকে দোষী না ভেবেও দোষ নেয়।
আরিফ ধৈর্যের সঙ্গে মুহিতকে বোঝায়।
— “তুই খেলতে চাইনি, তবুও খেলেছিস—দুজনেই সম অপরাধী।”
— “আমি নিজে নিজে খেতে পারি।”
আরিফ অবাক হয়—এই নতুন শেখা কি তবে নতুন যাত্রার সূচনা?
‘আপন ভুবন’ থেকে কান্নার ধ্বনি
রুনার মৃত্যু সংবাদ পেয়ে কেঁদে ওঠে আফরোজা বানু।
— “রুনা নামে একটা মেয়ে ছিল এ বাড়িতে, সে-ও চলে গেল।”
শাওনের মুখে এই নির্মম সত্য শোনা যায়।
রহমান সাহেব ভাবেন,
“সন্তানের চেয়ে সমাজকে বড় করে দেখা কি ঠিক হয়েছিল?”
আত্মীয়তার পুনর্দর্শন
পরদিন রওনা হন রুনার বাবা-মা, শাহজাহানপুরের পথে। দরজা খুলে দেয় আরিফ।
সাক্ষাতে চোখে জল এসে যায় আফরোজা বানুর।
আরিফ জানায়—
“রুনা বলেছিল, আপনারা একদিন আসবেন।”
— “স্বপ্নে দেখেছিল… তবে দেখা হবে না।”
শেষে রহমান সাহেব প্রস্তাব দেন—সব ভুলে ফিরে চলার।
আরিফ বলেন,
“আমার আর কে আছে ও ছাড়া? বাঁচার জন্য একটা অবলম্বন তো আমার থাকা দরকার।
তাঁরা বিদায় নিলেন।
বাড়ি থেকে নয়—একটা ভাঙা গল্পের ছায়া থেকে।
🔍 SEO Keywords:
বাংলা উপন্যাস, সুখ সুদূরে, বাবা ছেলে সম্পর্কের গল্প, বাংলা পারিবারিক গল্প, মা হারানো সন্তানের গল্প, আবেগঘন গল্প বাংলা, Bangla emotional story, Bangla Family Short Story, সন্তান ও বাবা সম্পর্কের গল্প

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন