📝 বর্ণনা (Meta Description):
সুখ সুদূরে দ্বিতীয় পর্বে ফুটে ওঠে বাবা-মা ও সন্তানের সম্পর্কের জটিলতা, বয়সের অনুশোচনা, বদলে যাওয়া মানসিকতা এবং এক গভীর মাতৃত্ববোধ।
🔖 কিওয়ার্ড (Keywords):
বাংলা উপন্যাস, সুখ সুদূরে, পারিবারিক গল্পে এগিয়ে চলছে।
🌼 সুখ সুদূরে – ২য় পর্ব
প্রথম দিকে লুকিয়ে পড়তেন। রহমান সাহেবের কণ্ঠ শুনলেই এখানে ওখানে গুঁজে রাখতেন। এখন আর সে প্রয়োজন হয় না। রহমান সাহেব আর আগের মতো কঠোর নেই। দুইবার স্ট্রোক হয়েছে, আরেকবার হলে বাঁচার সম্ভাবনা নেই—ডাক্তার আগেভাগেই সাবধান করেছেন।
এখন তিনি নিয়মিত নামাজ আদায় করেন, সদ্য দাড়ি রেখেছেন। ফর্সা গায়ের রঙ, ধবধবে সাদা চুল ও দাড়িতে তাঁর চেহারায় এক নূরানী আবহ ছড়িয়ে পড়েছে। আয়নার সামনে দাঁড়ালে তিনি আফসোস করে বলেন,
“অনেক দেরি হয়ে গেছে। সুন্নত হিসেবে দাড়ি রাখা অনেক আগেই উচিত ছিল।”
পরে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে নিজেই নিজেকে সান্ত্বনা দেন—
“আল্লাহ যখন হেদায়েত দিয়েছেন, তখনই রেখেছি। আল্লাহ না চাইলে কিছুই করা সম্ভব না।”
মানুষের প্রথম জীবনে নিজের শক্তিকেই সবচেয়ে বড় মনে হয়।
কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে শরীর ও মন দুর্বল হয়ে এলে সে অদৃশ্য শক্তির উপর নির্ভরতা
বাড়ায়। তখন মনে পড়ে, পরকালের জন্য কিছু নিয়ে যাওয়ার কথা।
রহমান সাহেব ভাবেন, তাঁর সময় বুঝি ফুরিয়ে এসেছে। প্রথমে মনে হয়েছিল, তিনি তো কোনও অন্যায় করেননি! মানুষ সাধারণত নিজের দোষ খুঁজে পায় না।
পরে ভাবলেন—ব্যবসার উন্নতির জন্য অনেক কৌশল নিয়েছিলেন, সেসবের মধ্যে কিছু অন্যায় থেকে থাকতেও পারে। এখন তিনি সেসব পাপ থেকে মুক্তি পেতে চান।
আফরোজা বানুর হাতে রুনার পুরনো চিঠির দিকে তাকিয়ে রহমান সাহেব বললেন,
“পড়া হলো?”
উত্তরের অপেক্ষা না করেই তিনি আবার বললেন,
“মুখস্থ হলো না এখনো? আর কতদিন পড়বে? চিঠির অবস্থা তো ভালো মনে হচ্ছে না।”
চেয়ার ঠেসে হেলান দিয়ে বসলেন। শরীরে ক্লান্তির ছাপ। আফরোজা বানু চুপ।
রহমান সাহেব এবার সামনের দিকে ঝুঁকে বললেন,
“কি সুখ পাও এটা পড়ে? কী লেখা আছে এতে?”
ভেজা গলায় আফরোজা বানু বললেন,
“আমি মা। তোমার মতো পাষাণ বাবা না।” “
ও আচ্ছা! তোমার মেয়ে তো বড় সোহাগী! মরে গেলে তো দু'মাস হয়ে যেত। একবারও তো বাবাকে দেখতে এলো না। বাবাই খালি পাষাণ!”
“সে তো তোমারই মেয়ে।”
“আমি কোন ভুল করেছিলাম? তোমার মনে হয় করেছিলাম?”
“রুনাও তার দৃষ্টিভঙ্গিতে ভুল করেনি।”
“তাহলে রুনাকে নিয়ে তোমার কোনও স্বপ্নই ছিল না! তার ইচ্ছেকে না মানাই ছিল আমার ভুল, তাই তো?”
“কি হতো যদি মেনে নিতে?”
কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে রহমান সাহেব জিজ্ঞেস করলেন,
“তুমিও তো সেদিন মানতে পারোনি, পেরেছিলে?”
আফরোজা বানুর মুখে কোনও উত্তর নেই। একটু পর বললেন,
“শাওনের বিয়েতে আমি ওকে ফিরিয়ে আনব।”
“কোথায় পাবে তাকে?”
“বাংলাদেশটা খুব বড় না। খুঁজলে নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে।”
“তাহলে এতদিন খুঁজোনি কেন?”
আফরোজা বানু চোখ তুলে তাকালেন। মুখে হাসির রেখা। নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করলেন,
“তাই তো! এতদিন খুঁজিনি কেন?”
সব দোষ রহমান সাহেবের ঘাড়ে চাপালেও প্রথম দিকে তিনিও রুনার চলে যাওয়াটা মেনে নিতে পারেননি।
কিন্তু মাতৃত্ব তার বুকের গভীরে চিরকাল ধ্বনিত হয়েছে। এবার মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলেন—রুনাকে খুঁজে বের করবেন।
তবে একথা ভাবলেই লজ্জা লাগে। কিন্তু লজ্জারই বা কী?
উপরের ঘরে শাওন রিপনকে ডেকে ডেকে হয়রান।
শাওন—রহমান ও আফরোজা বানুর একমাত্র ছেলে। রুনার ছোট ভাই। এক বছর আগে ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে এমবিএ শেষ করেছে।
বাবার ব্যবসার ভার নেওয়ার কথা থাকলেও বই পড়ে দিন কাটায়। বই পড়ার নতুন এক নেশা ধরেছে তার। আর তার সাথে পরিবর্তন এসেছে ভাষা ও আচরণে। কখনো পাণ্ডিত্যপূর্ণ কথা বলে, আবার কখনো অবাক করা হেয়ালি করে।
রহমান সাহেব ও আফরোজা বানু আগ্রহ নিয়ে উপরের দিকে তাকালেন।
রহমান সাহেব বললেন,
“ষাঁড়টা চেঁচাচ্ছে কেন?”
শাওন আবার ডাকল,
“ রিপন, রিপন!”
রিপনের বয়স আনুমানিক ষোলো-সতেরো। বাড়ির কাজের ছেলে। চেহারার মাসুম ভাব এখনও রয়ে গেছে। দু’বছর আগে এসেছে। কথায় কথায় কথা বলে, কাজে ফাঁকি দেয়। শাওনের একদম অপছন্দের। তবু বিদায় করা যাচ্ছে না—আফরোজা বানুর এক আত্মীয়ের ছেলে। মা মারা যাওয়ার পর বাবার দ্বিতীয় বিয়ের পর অবহেলায় বড় হচ্ছে দেখে আফরোজা তাকে নিয়ে এসেছেন। যদিও এখানেও সবার আদর পায় না, আফরোজা বানুর ছাড়া।
শাওন নতুন পাঞ্জাবির পকেট কেটে থলে দুটি টেবিলের উপর রেখেছে।
রিপন এসে বলল,
“ভাইজান, কি পাঞ্জাবির অফরেশন করছেন?”
দুই থলে হাতে নিয়ে বলল,
“দুইটা কিডনি। কিডনির অফরেশন!”
শাওন কড়া চোখে তাকাতেই থলে রেখে বলল,
“ডাকছিলেন ক্যান?”
“দেখ, ঘরে হলুদ সূতা আছে কিনা।”
“কইত্যে থাকব? সবারে দ আপনের মতো হইলদ্যা ভূতে ধরে নাই।”
“তোকে দেখতে বলেছি, আগে দেখ।”
“দেইখ্যা লাভ নাই। আমি জানি নাই।
মাকে জিজ্ঞেস করে আয়।”
কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে বলল,
“নাহ ভাইজান, নাই।”
শাওন চুপ করে কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর বলল,
“মোড়ের দোকান থেকে সুঁই আর হলুদ সূতা নিয়ে আয়।”
“আপনাগো এলাকার বড় সমস্যা হইছে, কাছেপিতে কোন দোকান নাই।”
“কে বলল নাই? সামনের ডিপার্টমেন্টাল দোকানটায় দেখ।”
রিপন বিড়বিড় করতে করতে বেরিয়ে গেল সূতা আনতে। গেট পেরিয়ে একটু দাঁড়িয়ে ভেবে নিল, কোনদিকে যাবে—ডানে না বামে? তারপর ডান দিকের ফুটপাত ধরে হাঁটতে লাগল। এখান দিয়ে প্রাইভেট কার চলে, বাস চলে না। ছেলেরা রাস্তায় স্ট্যাম্প বসিয়ে ক্রিকেট খেলে। রিপনও প্রায়ই খেলতে নামে।
রনি তাকে দেখে বলল,
“এই রিপন, খেলবি?”
রিপন থেমে ভাবল, শাওন ভাই রাগ করবে না তো? পরক্ষণেই মনে হলো—শাওনের মনে থাকবে না। পাগলের এক কথা বেশিক্ষণ মনে থাকে না। পাগল হয়ে যারচ্ছ ভাই, না হয় কেউ কি নতুন পাঞ্জাবি কিনে এনে পকেট কাটে? সেই ভাবনায় মগ্ন হয়ে রিপন খেলায় নেমে গেল।
শাওন পাঞ্জাবি পড়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল। গালে হাত দিয়ে দাড়ি দেখল। যথেষ্ট হয়েছে, এর বেশি বড় করা চলবে না। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে, দুই ঘণ্টা হয়ে গেছে—রিপন এখনও ফেরেনি।
“মা, মা!"
আফরোজা বানু এসে বললেন,
“ডাকছিস কেন?”
“রিপনকে দেখেছ?”
“সে তো তোর ঘরেই ছিল।”
“ছিল। পাঠিয়েছি সূতা আনতে। সেই যে গেল আর এলো না।”
“মনে হয় খেলায় নেমে পড়েছে।”
তারপর চোখ পড়ল কাটা পকেটের থলেতে।
“তুই পকেট কেটেছিস কেন?”
জবাব না দিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“তোমার কাছে হলুদ সূতা আছে?”
“সাদা আর কালো আছে। হলুদ নেই।”
“দেখেছ, রিপন এখনও এলো না।”
ঠিক তখনই রিপন এল। ক্লান্ত মুখে বলল,
“ভাইজান, দুনিয়াডা খুইজ্জা আইছি। সূতা পাইলাম না!”
“তুই খেলতে নেমেছিলি, তাই না?”
“না ভাইজান!
তাহলে তোকে পরিশ্রান্ত দেখাচ্ছে কেন?
দুনিয়াডা হাইট্টা আইছি। এমন তো দেখাইব।”
“নিউমার্কেট ছাড়া বুঝি মিলবে না!”
“ভাইজান, এই চৈত মাসে হইলদা ভূতে অনেকেরে ধরে। মনে হয় আপনেরেও ধরছে!”
শাওনের রাগ উঠল।
“চুপ কর। গিয়ে মায়ের কাছ থেকে সুঁই আর কালো সূতা আন।”
“শেষ-মেস কালা সূতা দিয়াই সিলাই করবেন? ঝিঁঙ্গা ফুলে ছেঙ্গা ধরছে এমন দেখাইব!”
“ঝিঁঙ্গা ফুলে ছেঙ্গা! বাহ! চমৎকার উপমা! বাদ দে, সেলাই করব না। যেমন আছে তেমন পরব।”
“ এটাই ভালা হইব। এই পাঞ্জাবি পইরা শর্মি আপার সামনে যান বুঝবেন ঠেলা!”
শর্মির নাম শুনেই শাওন থমকে যায়। বহুদিন তার সঙ্গে দেখা হয় না। এখন আর আগের মতো কথাও বলে না। শুধু শুধু বিরক্ত হয়।
নিচে রহমান সাহেব এখনও বসে আছেন। আফরোজা বানু পাশে এসে বসলেন।
রহমান সাহেব বললেন,
“শাওন ডাকছিল কেন?”
“পাগলামি। নতুন পাঞ্জাবি কিনে এনে পকেট কেটে বসে আছে! বলো এই পাগলামির মানে কী?”
রহমান সাহেব দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে নিচে তাকালেন।
“এতদিন শুধু কথাবার্তায় পাগলামি ছিল, এখন পোশাকেও! কপালে চিন্তার রেখা ফুটে উঠেছে।”
রিপন এসে বলল,
“একটা কথা কই। কুমিল্লায় একটা পাগলা গারদ আছে। খুব ভালো চিকিৎসা। শীতকালে শিগল দিয়া পানিতে নামায় রাখে, গরমে রইদে বাইন্ধা রাখে। অখন চৈত মাস, ভাইজনরে দুইদিন রইদে বাইন্ধা রাখলে ঠিক হইয়া যাইব।”
রহমান সাহেব পানির গ্লাস নামিয়ে কঠোর চোখে তাকালেন।
রিপন গলার স্বর নিচু করে বলল,
“অনুমতি লইয়াই দ কইলাম।”
রিপন চলে যেতে যেতে স্বর কমিয়ে বলল,
“ভালা কথা কই ভালা লাগে না। কয়দিন পর যখন পেন্টের তলি কাইট্টা হাঁটব তহন ভালা হইব।”
পুরনো দিনে হলে এমন কথা শোনার পরই রহমান সাহেব রিপনকে তাড়িয়ে দিতেন। কিন্তু সময় বদলে যায়, মানুষও। রহমান সাহেব বদলে গেছেন। চুপ করে রইলেন।
📌 উপন্যাসের পরবর্তী পর্ব পেতে “সুখ-সুদূরে” ব্লগটি নিয়মিত পড়ুন। মন্তব্য করুন। আপনার মতামত আমাদের অনুপ্রেরণা জোগাবে।
পরবর্তী পর্ব ২৬ জুন প্রকাশ করা হবে।
পড়ছি...
উত্তরমুছুনএকবারে সবটা পড়তে পারলে ভালো লাগতো
উত্তরমুছুনছেলে মেয়ে অবাধ্য হলে যা হয়
উত্তরমুছুনপুরো পর্ব কবে পাব?
উত্তরমুছুনপরের পর্ব পড়তে চাই
উত্তরমুছুনভালো
উত্তরমুছুনশুরুটা ভালো লাগছে।
উত্তরমুছুনভালো কিছুর অপেক্ষা
উত্তরমুছুন